জোটে জট! ISF-র ৪৩ আসনের দাবিতে চাপে আলিমুদ্দিন, ক্ষুব্ধ বাম শরিকরা – drishtibhongi.in

Viral_X
By
Viral_X
7 Min Read
#image_title

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মহলে ফের জোট-জট। আসন্ন লোকসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে বামফ্রন্ট ও ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট (ISF)-এর মধ্যে আসন বণ্টন নিয়ে তীব্র মতানৈক্য দেখা দিয়েছে। ISF-এর পক্ষ থেকে ৪৩টি বিধানসভা আসনে তাদের দাবি পেশ করায় আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে (সিপিআই(এম) রাজ্য সদর দফতর) প্রবল চাপ সৃষ্টি হয়েছে, একই সঙ্গে বামফ্রন্টের শরিক দলগুলির মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। এই টানাপোড়েন রাজ্যের তৃতীয় বিকল্প শক্তি গড়ে তোলার প্রচেষ্টায় বড়সড় ফাটল ধরাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

প্রেক্ষাপট ও সময়রেখা

পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্টের দীর্ঘ ৩৪ বছরের শাসনকাল ২০০৯ সাল থেকে দুর্বল হতে শুরু করে এবং ২০১১ সালে তৃণমূল কংগ্রেসের কাছে ক্ষমতা হারায়। এরপর থেকে রাজ্যের রাজনীতিতে বামেদের প্রভাব ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেস ও ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) দ্বিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতার আবহে বামেরা নিজেদের প্রাসঙ্গিকতা ধরে রাখতে নতুন জোটের সন্ধান করছিল। এই প্রেক্ষাপটেই ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে পীরজাদা আব্বাস সিদ্দিকীর নেতৃত্বে ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট (ISF)-এর আত্মপ্রকাশ হয়। ফুরফুরা শরীফের প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে সংখ্যালঘুদের ভোটব্যাংকে নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে চেয়েছিল ISF।

২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বামফ্রন্ট, কংগ্রেস এবং ISF মিলে 'সংযুক্ত মোর্চা' গঠন করে। এই মোর্চা আশানুরূপ ফল করতে পারেনি, যেখানে ISF শুধুমাত্র একটি আসনে (ভাঙ্গড়) জয়লাভ করে, এবং বাম ও কংগ্রেসের ফলাফল ছিল হতাশাজনক। তবে, ISF-এর এই সীমিত সাফল্য বামেদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয় – সংখ্যালঘু ভোটব্যাংকে তাদের প্রভাব এখনও বিদ্যমান এবং একটি নতুন শক্তি হিসেবে ISF-এর সম্ভাবনা রয়েছে। এরপর থেকে বামেরা ISF-কে একটি গুরুত্বপূর্ণ শরিক হিসেবে বিবেচনা করে আসছে, বিশেষত এমন সময়ে যখন বামেদের নিজস্ব সাংগঠনিক শক্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে।

মূল ঘটনাবলী ও সাম্প্রতিক পরিবর্তন

আসন্ন লোকসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে বামফ্রন্ট এবং ISF-এর মধ্যে আসন বণ্টন নিয়ে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে আলোচনা চলছিল। প্রাথমিক আলোচনাগুলি মূলত সৌহার্দ্যপূর্ণ থাকলেও, সম্প্রতি ISF-এর পক্ষ থেকে ৪৩টি বিধানসভা আসনে তাদের দাবি পেশ করার পরই পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করে। এই ৪৩টি আসন মূলত দক্ষিণ ২৪ পরগনা, উত্তর ২৪ পরগনা, মুর্শিদাবাদ, মালদা এবং হুগলির মতো জেলাগুলিতে ছড়িয়ে রয়েছে, যেখানে সংখ্যালঘু ভোট একটি নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করে।

আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ISF-এর এই দাবি বামফ্রন্টের শীর্ষ নেতৃত্বকে স্তম্ভিত করেছে। তাদের মতে, ২০২১ সালের নির্বাচনে একটি মাত্র আসনে জয়ী হওয়া একটি দলের পক্ষে এত বড় সংখ্যক আসনে দাবি করা অযৌক্তিক। এই ৪৩টি আসনের মধ্যে অনেকগুলিতেই বামফ্রন্টের শরিক দলগুলির দীর্ঘদিনের শক্তিশালী ঘাঁটি রয়েছে, যেখানে তাদের নিজস্ব প্রার্থী দাঁড়ানোর ঐতিহ্য রয়েছে।

এই দাবির ফলে বামফ্রন্টের শরিক দলগুলির মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। রেভোলিউশনারি সোশ্যালিস্ট পার্টি (RSP), ফরওয়ার্ড ব্লক (FB) এবং ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (CPI)-এর মতো দলগুলি স্পষ্ট জানিয়েছে যে, তাদের ঐতিহ্যবাহী আসনগুলি ISF-কে ছেড়ে দেওয়া সম্ভব নয়। আরএসপি-এর এক বরিষ্ঠ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, "আমরা দীর্ঘকাল ধরে এই আসনগুলিতে লড়াই করছি। আমাদের কর্মীদের কঠোর পরিশ্রম রয়েছে। হঠাৎ করে একটি নতুন দল এসে এতগুলি আসন দাবি করলে তা মেনে নেওয়া অসম্ভব।" ফরওয়ার্ড ব্লকের পক্ষ থেকেও অনুরূপ প্রতিক্রিয়া এসেছে, যেখানে তারা তাদের নিজস্ব প্রভাবাধীন আসনগুলি ছাড়তে নারাজ।

সিপিআই(এম)-এর রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম এবং বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসু এই সংকট নিরসনে দফায় দফায় আলোচনা করছেন, কিন্তু এখনও পর্যন্ত কোনো সমাধান সূত্র মেলেনি। ISF-এর পক্ষ থেকে পীরজাদা আব্বাস সিদ্দিকী এবং নওশাদ সিদ্দিকী তাদের অবস্থানে অনড় রয়েছেন বলে খবর। তাদের যুক্তি, ২০২১ সালের নির্বাচনে তারা এককভাবে লড়ে প্রমাণ করেছেন যে তাদের জনপ্রিয়তা রয়েছে এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায় তাদের উপর আস্থা রাখছে। তাই, একটি কার্যকর জোটের জন্য তাদের দাবিকে গুরুত্ব সহকারে দেখা উচিত।

প্রভাব

এই জোট-জট পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে:

বামফ্রন্টের ঐক্যে ফাটল

ISF-এর দাবি এবং শরিক দলগুলির ক্ষোভ বামফ্রন্টের দীর্ঘদিনের ঐক্যে ফাটল ধরাতে পারে। যদি শরিক দলগুলি তাদের দাবি থেকে সরে না আসে এবং ISF-ও অনড় থাকে, তবে জোট ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এটি বামেদের সামগ্রিক শক্তিকে আরও দুর্বল করে দেবে।

নির্বাচনী ফলাফলে প্রভাব

যদি বামফ্রন্ট এবং ISF আলাদাভাবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে, তবে ধর্মনিরপেক্ষ ও বামপন্থী ভোটব্যাংক বিভক্ত হয়ে যাবে। এর ফলে তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিজেপির সুবিধা হবে, যারা এই মুহূর্তে রাজ্যের প্রধান দুই শক্তি। তৃতীয় বিকল্প হিসেবে একটি শক্তিশালী জোটের সম্ভাবনা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাবে। এটি ভোটারদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করতে পারে, যারা একটি বিকল্প খুঁজছেন।

ISF-এর ভাবমূর্তি

ISF-এর এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী দাবি তাদের ভাবমূর্তির উপরও প্রভাব ফেলবে। একদিকে যেমন এটি তাদের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা প্রদর্শন করে, অন্যদিকে এটি তাদের 'সুবিধাবাদী' হিসেবেও চিহ্নিত করতে পারে, যা তাদের দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক যাত্রায় বাধা সৃষ্টি করতে পারে।

নির্দিষ্ট নির্বাচনী এলাকায় প্রভাব

যে ৪৩টি আসনে ISF দাবি জানাচ্ছে, সেগুলি মূলত সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকা। এই আসনগুলিতে বামফ্রন্টের ঐতিহ্যবাহী ভোটব্যাংক রয়েছে। যদি এই আসনগুলিতে জোট না হয়, তবে উভয় পক্ষের ভোট কাটাকাটি হবে, যার ফলে অন্য প্রার্থীরা সুবিধা পাবে। উদাহরণস্বরূপ, ভাঙ্গড়, মগরাহাট, মেটিয়াবুরুজ, ডোমকল, রানিনগর, সুজাপুর, ইটাহার ইত্যাদি এলাকায় এই প্রভাব স্পষ্ট হতে পারে।

ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ ও সম্ভাব্য মাইলফলক

এই মুহূর্তে বামফ্রন্ট এবং ISF উভয় পক্ষই একটি কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড়িয়ে। আসন্ন লোকসভা নির্বাচনের মনোনয়ন জমা দেওয়ার সময়সীমা ঘনিয়ে আসছে, তাই দ্রুত একটি সমাধান সূত্র খুঁজে বের করা অপরিহার্য।

আলোচনার চূড়ান্ত পর্যায়: বামফ্রন্ট নেতৃত্ব এবং ISF-এর মধ্যে আরও কয়েক দফা উচ্চপর্যায়ের আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থান কিছুটা নরম করে একটি মধ্যপন্থা খুঁজে বের করার চেষ্টা করতে পারে।
* কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের হস্তক্ষেপ: সিপিআই(এম)-এর কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এই বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারে। পলিটব্যুরো এই সংকটের সমাধান করতে রাজ্য নেতৃত্বকে নির্দিষ্ট নির্দেশ দিতে পারে।
* চাপের মুখে সিদ্ধান্ত: যদি কোনো সমাধান না হয়, তবে উভয় পক্ষই নিজেদের মতো করে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হবে। ISF হয়তো এককভাবে কিছু আসনে লড়ার ঘোষণা করতে পারে, অথবা অন্য কোনো ছোট দলের সঙ্গে জোট বাঁধতে পারে। বামফ্রন্টও তাদের শরিকদের নিয়ে বাকি আসনগুলিতে লড়ার প্রস্তুতি নেবে।
* জনমত গঠন: উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকলে জনমত তাদের বিরুদ্ধে যেতে পারে। ভোটাররা একটি ঐক্যবদ্ধ বিকল্পের অভাব বোধ করলে তাদের প্রতি সমর্থন হারাতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মুহূর্তে উভয় পক্ষেরই নমনীয় হওয়া জরুরি। ISF-কে তাদের দাবির সংখ্যা কমাতে হবে এবং বামফ্রন্টকেও ISF-এর উত্থানকে স্বীকার করে তাদের জন্য সম্মানজনক আসন ছাড়তে হবে। অন্যথায়, এই জোট-জট পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে আরও একটি ব্যর্থ অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হবে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই এই সংকটের সমাধান হবে নাকি জোট ভেঙে যাবে, তা স্পষ্ট হয়ে যাবে।

জোটে জট! ISF-র ৪৩ আসনের দাবিতে চাপে আলিমুদ্দিন, ক্ষুব্ধ বাম শরিকরা - drishtibhongi.in

Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply