সংসদ সদস্যদের শপথ: প্রধান বিচারপতির হাতে ঐতিহাসিক দায়িত্ব?
সংসদ সদস্যদের শপথ: প্রধান বিচারপতির হাতে ঐতিহাসিক দায়িত্ব?
আগামী ১৬ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। এই গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী স্বয়ং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের শপথ পড়াতে পারেন বলে জোরালো জল্পনা চলছে। সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, এই ব্যতিক্রমী পদক্ষেপের প্রস্তুতি চলছে, যা দেশের সংসদীয় ইতিহাসে একটি নতুন নজির স্থাপন করতে পারে।
সাধারণত জাতীয় সংসদের স্পিকার অথবা তার অনুপস্থিতিতে ডেপুটি স্পিকার নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ বাক্য পাঠ করিয়ে থাকেন। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে সাংবিধানিক ব্যাখ্যা এবং সংসদীয় রীতির জটিলতার কারণে প্রধান বিচারপতির এই সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
পটভূমি ও সময়রেখা
গত ৭ জানুয়ারি ২০২৪ তারিখে বাংলাদেশে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে, যেখানে তারা ২২২টি আসনে জয়লাভ করে। এছাড়া ৬২ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী, জাতীয় পার্টি ১১টি এবং অন্যান্য দল ৫টি আসনে বিজয়ী হয়। নির্বাচনের ফলাফল গেজেট আকারে প্রকাশিত হয় ৯ জানুয়ারি।
সংবিধান অনুযায়ী, গেজেট প্রকাশের তিন দিনের মধ্যে অথবা সংসদের প্রথম অধিবেশন বসার আগে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ সম্পন্ন করতে হয়। এই প্রক্রিয়া গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদ: শপথের বিধিবিধান
বাংলাদেশের সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদ সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ সংক্রান্ত বিস্তারিত বিধান প্রদান করে। ১৪৮(২ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ সদস্যরা স্পিকারের কাছে শপথ গ্রহণ করবেন। তবে, ১৪৮(৩) অনুচ্ছেদ একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রমের কথা বলে: “যদি স্পিকারের পদ শূন্য হয়, অথবা স্পিকার কার্যভার পালনে অসমর্থ হন, অথবা স্পিকার অনুপস্থিত থাকেন, তবে প্রধান বিচারপতি অথবা তার মনোনীত কোনো বিচারপতি শপথ বাক্য পাঠ করাবেন।”
স্পিকারের ভূমিকা ও বর্তমান প্রেক্ষাপট
একাদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী এবং ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু উভয়েই দ্বাদশ সংসদে পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। কিন্তু সাংবিধানিকভাবে, পূর্ববর্তী সংসদের স্পিকারের পদ নতুন সংসদ গঠিত হওয়ার আগ পর্যন্ত কার্যকর থাকে কিনা, তা নিয়ে আইনি বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। একাদশ সংসদ গত ২৯ জানুয়ারি বিলুপ্ত হওয়ায়, নতুন সংসদ গঠন হওয়ার আগে স্পিকারের পদ সাময়িকভাবে শূন্য বলে বিবেচিত হতে পারে বলে কিছু আইন বিশেষজ্ঞ মত দিয়েছেন। এই আইনি শূন্যতা পূরণের জন্যই প্রধান বিচারপতির সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে আলোচনা জোরদার হয়েছে।
সাম্প্রতিক অগ্রগতি
নির্বাচনের পর থেকেই নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে সংসদ সচিবালয় এবং সরকারের উচ্চপর্যায়ে নিবিড় আলোচনা চলছে। সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞ এবং আইনজ্ঞদের মতামত গ্রহণ করা হয়েছে, যাতে শপথ গ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ আইনসম্মত এবং বিতর্কমুক্ত হয়।
সংসদ সচিবালয়ের প্রস্তুতি
সংসদ সচিবালয় ১৬ ফেব্রুয়ারি শপথ গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। জল্পনা অনুযায়ী, সংসদ ভবনের শপথ কক্ষে এই অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। প্রধান বিচারপতির কার্যালয়ের সাথেও প্রাথমিক যোগাযোগ স্থাপন করা হয়েছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে। যদিও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনো আসেনি, তবে প্রধান বিচারপতির সম্ভাব্য উপস্থিতির জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটোকল এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতামত
বেশ কয়েকজন প্রখ্যাত আইন বিশেষজ্ঞ সংবিধানের ১৪৮(৩) অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যায় একমত হয়েছেন যে, স্পিকারের পদ শূন্য থাকলে প্রধান বিচারপতি শপথ পড়াতে পারেন। তাদের মতে, যেহেতু একাদশ সংসদ বিলুপ্ত হয়েছে এবং নতুন সংসদের স্পিকার এখনো নির্বাচিত হননি, তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে স্পিকারের পদ সাময়িকভাবে শূন্য বলে বিবেচিত হতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে প্রধান বিচারপতির শপথ পড়ানো সম্পূর্ণ সাংবিধানিক হবে এবং কোনো প্রকার বিতর্কের অবকাশ রাখবে না। এই পদক্ষেপ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি সরকারের অঙ্গীকারকেও সুদৃঢ় করবে।
প্রভাব ও তাৎপর্য
যদি প্রধান বিচারপতি নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পড়ান, তবে এটি বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হবে। এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব থাকতে পারে দেশের সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার উপর।
গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার উপর প্রভাব
এই পদক্ষেপ নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সাংবিধানিক বৈধতাকে আরও সুদৃঢ় করবে। এটি নিশ্চিত করবে যে, সংসদ গঠন প্রক্রিয়া কোনো আইনি জটিলতা বা বিতর্কের মুখে পড়বে না। জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্রুত ও বৈধভাবে তাদের দায়িত্ব পালনের সুযোগ করে দেবে, যা গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য। এটি বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা এবং সাংবিধানিক রক্ষক হিসেবে এর ভূমিকাকে আরও স্পষ্ট করবে।
ভবিষ্যৎ সংসদীয় কার্যধারা
এই ঘটনা ভবিষ্যতে অনুরূপ পরিস্থিতিতে একটি নজির স্থাপন করতে পারে। এটি সংসদীয় কার্যধারা এবং সংবিধানের ব্যাখ্যায় একটি নতুন মাত্রা যোগ করবে। ভবিষ্যতে যদি কখনো স্পিকারের পদ নিয়ে একই ধরনের আইনি প্রশ্ন দেখা দেয়, তবে এই উদাহরণ অনুসরণ করা যেতে পারে। এটি সংসদীয় নিয়মকানুন এবং সাংবিধানিক প্রোটোকলকে আরও সুনির্দিষ্ট করতে সাহায্য করবে।
এছাড়াও, এটি জনগণের মধ্যে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থা বৃদ্ধি করবে, এই বার্তা দিয়ে যে, সাংবিধানিক প্রক্রিয়াগুলো সর্বোচ্চ গুরুত্ব সহকারে পালন করা হচ্ছে।
পরবর্তী পদক্ষেপ
শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের পর দ্বাদশ জাতীয় সংসদের কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে। বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সংসদের প্রথম অধিবেশন
শপথ গ্রহণের পর দ্রুতই দ্বাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করা হবে। এই অধিবেশনে সংসদ সদস্যরা তাদের প্রথম আনুষ্ঠানিক কার্যক্রমে অংশ নেবেন। প্রথম অধিবেশন সাধারণত নতুন সংসদের সূচনা এবং এর কার্যপরিধি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন
সংসদের প্রথম অধিবেশনেই সংসদ সদস্যরা তাদের মধ্য থেকে নতুন স্পিকার এবং ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করবেন। এটি সংসদের অভ্যন্তরীণ পরিচালনার জন্য একটি অপরিহার্য পদক্ষেপ। নির্বাচিত স্পিকার পরবর্তীতে সংসদের কার্যক্রমে সভাপতিত্ব করবেন এবং সংসদীয় রীতিনীতি বজায় রাখবেন। ডেপুটি স্পিকার স্পিকারের অনুপস্থিতিতে তার দায়িত্ব পালন করবেন।
এরপর সংসদীয় কমিটি গঠন, রাষ্ট্রপতির ভাষণ এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কার্যক্রম শুরু হবে। এই পুরো প্রক্রিয়াটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার ধারাবাহিকতা এবং স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে।
