Mamata Banerjee: ‘DA নিয়ে আমরাও কমিটি গঠন করেছি’, এবিপি আনন্দে এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে মুখ্যমন্ত্রী

Viral_X
By
Viral_X
8 Min Read
#image_title

DA নিয়ে নতুন মোড়: মুখ্যমন্ত্রীর 'কমিটি' ঘোষণায় কি মিটবে বাংলার সরকারি কর্মীদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ?

DA নিয়ে নতুন মোড়: মুখ্যমন্ত্রীর 'কমিটি' ঘোষণায় কি মিটবে বাংলার সরকারি কর্মীদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ?

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সম্প্রতি রাজ্য সরকারি কর্মীদের বকেয়া মহার্ঘ ভাতা (DA) সংক্রান্ত বিতর্কিত ইস্যুতে একটি কমিটি গঠনের ঘোষণা করেছেন। এবিপি আনন্দকে দেওয়া এক এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে মুখ্যমন্ত্রী জানান, তাঁর সরকার এই দীর্ঘস্থায়ী দাবি খতিয়ে দেখতে সক্রিয়ভাবে একটি কমিটি গঠন করেছে। এই পদক্ষেপ রাজ্য জুড়ে বিভিন্ন কর্মচারী ইউনিয়নের লাগাতার বিক্ষোভ এবং আইনি লড়াইয়ের আবহে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মুখ্যমন্ত্রীর এই ঘোষণা কর্মীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে, যেখানে কেউ কেউ আশার আলো দেখছেন, আবার কেউ কেউ এটিকে কেবল সময়ক্ষেপণের কৌশল হিসেবে দেখছেন। এই কমিটি গঠন রাজ্যের আর্থিক সক্ষমতা এবং কর্মীদের ন্যায্য অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য আনার একটি প্রচেষ্টার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

প্রেক্ষাপট ও সময়রেখা

মহার্ঘ ভাতা বা Dearness Allowance হলো সরকারি কর্মচারী ও পেনশনভোগীদের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সাথে সামঞ্জস্য রেখে তাদের বেতন ও পেনশনে প্রদত্ত একটি অতিরিক্ত অর্থ। এটি মূল্যস্ফীতির প্রভাব মোকাবিলায় সহায়তা করে। ভারতে কেন্দ্রীয় সরকার এবং বিভিন্ন রাজ্য সরকার তাদের কর্মীদের জন্য এটি প্রদান করে থাকে। তবে, পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মীদের তুলনায় রাজ্য সরকারি কর্মীদের DA-এর হার দীর্ঘদিন ধরেই উল্লেখযোগ্যভাবে কম। এই বৈষম্যই রাজ্যে তীব্র অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে।

গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে, পশ্চিমবঙ্গের সরকারি কর্মচারীরা কেন্দ্রের সমহারে DA প্রদানের দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন। বিভিন্ন কর্মচারী সংগঠন, যেমন সংগ্রামী যৌথ মঞ্চ, কো-অর্ডিনেশন কমিটি, এবং অন্যান্যরা দফায় দফায় ধর্মঘট, কর্মবিরতি, এবং গণঅবস্থান কর্মসূচির আয়োজন করেছে। এই আন্দোলনগুলি প্রায়শই রাজ্য সচিবালয় নবান্ন এবং কলকাতার রাজপথে উত্তাপ ছড়িয়েছে।

২০১৬ সালে ষষ্ঠ বেতন কমিশন গঠিত হওয়ার পর, DA সংক্রান্ত বিষয়টি আরও জটিল হয়। কমিশনের সুপারিশ এবং রাজ্য সরকারের আর্থিক সীমাবদ্ধতার যুক্তি প্রায়শই কর্মীদের দাবি পূরণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজ্য সরকার বারবারই রাজ্যের আর্থিক দুর্বলতাকে DA বৃদ্ধির পথে প্রধান অন্তরায় হিসেবে তুলে ধরেছে, যা কর্মীদের মধ্যে আরও ক্ষোভের সঞ্চার করেছে।

আইনি ক্ষেত্রেও এই ইস্যুটি বারবার আলোচিত হয়েছে। রাজ্যের প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল (SAT) এবং কলকাতা হাইকোর্ট একাধিকবার রাজ্য সরকারকে বকেয়া DA পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছে। ২০১৯ সালের আগস্ট মাসে SAT রাজ্য সরকারকে বকেয়া DA পরিশোধের নির্দেশ দেয়, যা পরে কলকাতা হাইকোর্টও বহাল রাখে। হাইকোর্ট তার রায়ে উল্লেখ করে যে DA কর্মীদের মৌলিক অধিকার এবং এটি ভিক্ষা নয়।

তবে, রাজ্য সরকার এই রায়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করে। সুপ্রিম কোর্টে এই মামলা এখনও বিচারাধীন রয়েছে, যা কর্মীদের মধ্যে হতাশা বাড়িয়েছে। এই আইনি দীর্ঘসূত্রতা এবং সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের অভাবে কর্মীদের ক্ষোভ ক্রমশ বাড়তে থাকে, যার ফলস্বরূপ সাম্প্রতিক মাসগুলিতে আরও তীব্র আন্দোলন দেখা যায়।

সাম্প্রতিক অগ্রগতি

মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবিপি আনন্দকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নিশ্চিত করেন যে, "আমরাও কমিটি গঠন করেছি" DA সংক্রান্ত বিষয় খতিয়ে দেখতে। এই ঘোষণাটি সুপ্রিম কোর্টে মামলার শুনানির ঠিক আগে বা পরে এসেছে, যা এর তাৎপর্যকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। যদিও কমিটি গঠনের তারিখ বা এর সদস্যদের নাম তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি, তবে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য রাজ্যের এই দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার সমাধানে একটি নতুন দিকনির্দেশনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

এই কমিটির মূল উদ্দেশ্য হবে DA সংক্রান্ত বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখা। এর মধ্যে থাকতে পারে রাজ্যের আর্থিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা, অন্যান্য রাজ্যের DA প্রদানের মডেল বিশ্লেষণ, এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে রাজ্যের DA হারের তুলনামূলক অধ্যয়ন। কমিটি সম্ভবত একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে তাদের সুপারিশ জমা দেবে, যা সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপের ভিত্তি তৈরি করবে।

কর্মচারী সংগঠনগুলির প্রতিক্রিয়া এই ঘোষণায় মিশ্র। সংগ্রামী যৌথ মঞ্চের মতো কিছু সংগঠন মুখ্যমন্ত্রীর এই ঘোষণাকে "ধাপ্পাবাজি" বা "চোখে ধুলো দেওয়ার চেষ্টা" হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। তাদের মতে, যখন সুপ্রিম কোর্টে মামলা চলছে, তখন কমিটি গঠনের ঘোষণা কেবল সময় নষ্ট করার একটি কৌশল। তারা দাবি করেছে যে, সরকার যদি সত্যিই কর্মীদের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়, তবে অবিলম্বে বকেয়া DA পরিশোধের জন্য একটি রোডম্যাপ ঘোষণা করা উচিত।

অন্যদিকে, কিছু সংগঠন এবং কর্মীরা এই পদক্ষেপকে একটি ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, অন্তত সরকার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে প্রস্তুত, যা অতীতে খুব কমই দেখা গেছে। তারা আশা করছেন যে, এই কমিটি নিরপেক্ষভাবে কাজ করবে এবং কর্মীদের ন্যায্য দাবি পূরণের জন্য একটি কার্যকর সমাধান প্রস্তাব করবে।

প্রভাব

মুখ্যমন্ত্রীর এই কমিটি গঠনের ঘোষণা পশ্চিমবঙ্গের লক্ষ লক্ষ রাজ্য সরকারি কর্মচারী, পেনশনভোগী এবং শিক্ষক-শিক্ষিকাদের উপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে। বর্তমানে, কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মীদের তুলনায় রাজ্যের কর্মীরা প্রায় ৩৫ শতাংশ কম DA পাচ্ছেন, যা তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় বিশাল আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে। এই কমিটি যদি DA বৃদ্ধির পক্ষে সুপারিশ করে এবং সরকার তা কার্যকর করে, তবে এটি কর্মীদের আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য অনেকাংশে ফিরিয়ে আনবে।

আর্থিক দিক থেকে, DA বৃদ্ধি রাজ্যের কোষাগারের উপর একটি উল্লেখযোগ্য বোঝা চাপাবে। একটি আনুমানিক হিসাব অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় হারে DA দিতে হলে রাজ্য সরকারকে প্রতি বছর কয়েক হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করতে হবে। এই অতিরিক্ত ব্যয় সামাল দেওয়া রাজ্যের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে, বিশেষ করে যখন রাজ্য সরকার নিজেই আর্থিক সীমাবদ্ধতার কথা বারবার উল্লেখ করছে।

রাজনৈতিকভাবে, এই ইস্যুটি রাজ্যের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। আসন্ন পঞ্চায়েত নির্বাচন এবং ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে DA ইস্যু সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কর্মীদের অসন্তোষ ভোট বাক্সে প্রতিফলিত হতে পারে, যা শাসক দলের জন্য উদ্বেগজনক। কমিটি গঠন করে মুখ্যমন্ত্রী একদিকে যেমন কর্মীদের আন্দোলনকে প্রশমিত করার চেষ্টা করছেন, তেমনি অন্যদিকে জনগণের সামনে একটি গঠনমূলক পদক্ষেপের বার্তা দিতে চাইছেন।

কর্মীদের মনোবল এবং কর্মসংস্কৃতির উপরও DA ইস্যুর বড় প্রভাব রয়েছে। দীর্ঘদিনের বঞ্চনা এবং আইনি লড়াইয়ের কারণে অনেক কর্মীর মধ্যে হতাশা এবং ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। একটি ইতিবাচক সমাধান তাদের মনোবল ফিরিয়ে আনতে এবং সরকারি পরিষেবার মান উন্নত করতে সাহায্য করবে। এর বিপরীত হলে, অসন্তোষ আরও বাড়তে পারে।

ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ

কমিটি গঠনের পর এখন সবার নজর এর কার্যকারিতা এবং সুপারিশের দিকে। কমিটির একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে তাদের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা। এই প্রতিবেদনে কী সুপারিশ করা হয়, তার উপর নির্ভর করবে রাজ্য সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ। কমিটি যদি DA বৃদ্ধির পক্ষে সুপারিশ করে, তবে সরকার কীভাবে সেই সুপারিশ বাস্তবায়ন করবে, তা দেখার বিষয়।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কমিটি সম্ভবত ধাপে ধাপে DA বৃদ্ধির একটি প্রস্তাবনা দিতে পারে, যা রাজ্যের আর্থিক সক্ষমতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। একবারে সম্পূর্ণ বকেয়া DA পরিশোধ করা রাজ্যের পক্ষে কঠিন হতে পারে। তাই, একটি সুচিন্তিত এবং বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ প্রয়োজন।

Mamata Banerjee: 'DA নিয়ে আমরাও কমিটি গঠন করেছি', এবিপি আনন্দে এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে মুখ্যমন্ত্রী

কর্মচারী ইউনিয়নগুলিও কমিটির প্রতিবেদনের দিকে তাকিয়ে আছে। যদি কমিটির সুপারিশগুলি তাদের প্রত্যাশা পূরণ না করে বা সরকার সেগুলি কার্যকর করতে বিলম্ব করে, তবে ইউনিয়নগুলি আবারও আন্দোলন শুরু করতে পারে। সুপ্রিম কোর্টের রায়ও এই ইস্যুতে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেবে। যদি সুপ্রিম কোর্ট হাইকোর্টের রায় বহাল রাখে, তবে রাজ্য সরকারের উপর DA পরিশোধের জন্য আরও চাপ বাড়বে।

রাজ্য সরকারকে একদিকে কর্মীদের ন্যায্য দাবি, অন্যদিকে রাজ্যের আর্থিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। এই কমিটি গঠন সেই ভারসাম্যের সন্ধানে একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ হতে পারে। তবে, চূড়ান্ত সমাধান না হওয়া পর্যন্ত এই ইস্যুটি পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি এবং প্রশাসনে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে থাকবে। আগামী দিনগুলিতে কমিটির কাজ, তার সুপারিশ এবং সরকারের প্রতিক্রিয়া এই দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।

Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply