ইরানের অগ্নিপরীক্ষা: সরকার কি পারবে এবারের বিক্ষোভ সামাল দিতে?
ইরানের অগ্নিপরীক্ষা: সরকার কি পারবে এবারের বিক্ষোভ সামাল দিতে?
ইরান গত কয়েক মাস ধরে নতুন এক গণবিক্ষোভের ঢেউয়ে উত্তাল। ২০২২ সালের শেষ দিক থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে আবারও সামনে এনেছে। তেহরান, মাশহাদ, ইসফাহান এবং শিরাজসহ দেশটির প্রধান শহরগুলোতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া এই বিক্ষোভ ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের কর্তৃত্বের জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। বর্তমান প্রশাসন এই চলমান জনরোষকে কার্যকরভাবে দমন করতে পারবে কিনা, তা এখন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের প্রধান প্রশ্ন।
প্রেক্ষাপট ও সময়রেখা
ইরানে জনবিক্ষোভের ইতিহাস সুদীর্ঘ। ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের পর থেকেই বিভিন্ন সময়ে সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষ দানা বেঁধেছে। তবে সাম্প্রতিক এই আন্দোলন তার তীব্রতা ও ব্যাপ্তির দিক থেকে পূর্বের অনেক ঘটনাকে ছাপিয়ে গেছে। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট, সামাজিক বিধিনিষেধ, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং দুর্নীতির অভিযোগ জনগণের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি করেছে।
১৯৯৯ সালে ছাত্র বিক্ষোভ একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল, যা সরকার কঠোর হাতে দমন করে। এরপর ২০০৯ সালের বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর শুরু হওয়া 'গ্রিন মুভমেন্ট' ছিল আরও বড় আকারের। সে সময় লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে আসে, কিন্তু সরকার ব্যাপক দমন-পীড়ন চালিয়ে তা নিয়ন্ত্রণে আনে।
২০১৭-১৮ সালে অর্থনৈতিক ইস্যুতে দেশজুড়ে ছোট শহরগুলোতেও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। এরপর ২০১৯ সালে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে যে বিক্ষোভ হয়, তা ছিল বিশেষভাবে সহিংস। সরকারি হিসাবে শতাধিক এবং বেসরকারি হিসাবে কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়। সে সময় ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে সরকার দ্রুত আন্দোলন দমন করে।
বর্তমান বিক্ষোভের সূত্রপাত হয় ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে। ২২ বছর বয়সী মাহসা আমিনির মৃত্যুর ঘটনা এই আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ হিসেবে কাজ করে। হিজাব আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে নীতি পুলিশের হাতে আটক হওয়ার পর তার মৃত্যু দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। এই ঘটনা ইরানের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।
মাহসা আমিনির মৃত্যুর প্রতিবাদে প্রাথমিকভাবে নারীরা রাস্তায় নামলেও, দ্রুতই তা নারী অধিকারের গণ্ডি পেরিয়ে broader anti-establishment আন্দোলনে রূপ নেয়। "নারী, জীবন, স্বাধীনতা" (زن، زندگی، آزادی) স্লোগানটি এই আন্দোলনের মূলমন্ত্রে পরিণত হয় এবং সমাজের সকল স্তরের মানুষকে একত্রিত করে। এটি শুধু হিজাব বিরোধিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং সরকারের সামগ্রিক নীতির বিরুদ্ধে এক বৃহত্তর প্রতিবাদের জন্ম দেয়।
সাম্প্রতিক ঘটনাবলী
সাম্প্রতিক এই বিক্ষোভের প্রকৃতি পূর্বের আন্দোলনগুলো থেকে ভিন্ন। এবার শুধু নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠী নয়, ছাত্র, শ্রমিক, নারী, এবং জাতিগত সংখ্যালঘুসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ আন্দোলনে অংশ নিচ্ছে। আন্দোলনটি আরও বেশি টেকসই এবং তুলনামূলকভাবে কম কেন্দ্রীভূত। এর ফলে সরকারের পক্ষে আন্দোলনকারীদের চিহ্নিত করা ও দমন করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
সরকারের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া ছিল কঠোর দমন-পীড়ন। বিক্ষোভকারীদের উপর বলপ্রয়োগ, ব্যাপক ধরপাকড়, ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা এবং এমনকি প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করা হয়। হাজার হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং অনেককে দীর্ঘ কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই দমন-পীড়নের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।
দমন-পীড়নের পাশাপাশি সরকার কিছু ক্ষেত্রে সংস্কারের ইঙ্গিতও দিয়েছে। নীতি পুলিশের ভূমিকা পর্যালোচনা এবং বিচার বিভাগীয় সংস্কারের কথা বলা হলেও, এগুলোকে প্রায়শই ফাঁকা বুলি হিসেবে দেখা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বিক্ষোভকে "দাঙ্গা" আখ্যা দিয়ে বিদেশি শক্তির মদদপুষ্ট বলে প্রচার করা হয়েছে, যা জনগণের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির একটি কৌশল হিসেবে বিবেচিত।
ভীতি প্রদর্শনের জন্য সরকার বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে, যার মধ্যে জনসমক্ষে ফাঁসি কার্যকর করাও রয়েছে। এ পর্যন্ত বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারীকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র নিন্দার জন্ম দিয়েছে এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোকে আরও সোচ্চার করে তুলেছে। এই পদক্ষেপগুলি জনগণের মধ্যে ভয় ছড়ানোর চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরান ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্র এই দমন-পীড়নের নিন্দা জানিয়েছে এবং ইরানের উপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এই চাপ ইরানের অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের উপর আরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, যা দেশটির বিশ্বব্যাপী ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
দেশের ভেতরেও নিরাপত্তা বাহিনী বা রাজনৈতিক অভিজাতদের মধ্যে কিছু ভিন্নমতের খবর পাওয়া গেছে, যদিও এর পরিমাণ বা প্রভাব সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য নেই। ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং মুদ্রার অবমূল্যায়ন এই বিক্ষোভের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করছে। জনগণের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার মান ক্রমাগত অবনতির দিকে যাচ্ছে, যা অসন্তোষকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
প্রভাব
এই চলমান বিক্ষোভের প্রভাব সুদূরপ্রসারী এবং সমাজের প্রতিটি স্তরে অনুভূত হচ্ছে। বিক্ষোভকারীরা গ্রেপ্তারের ঝুঁকি, আহত হওয়া, মৃত্যু, নির্যাতন এবং দীর্ঘ কারাদণ্ডের মুখে পড়ছে। এই পরিস্থিতি তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপরও গুরুতর প্রভাব ফেলছে এবং অনেক পরিবারকে দীর্ঘস্থায়ী ট্রমার শিকার করছে।
সরকারের জন্য এটি একটি গভীর বৈধতা সংকট তৈরি করেছে। অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়েছে এবং নিরাপত্তা বজায় রাখতে গিয়ে অর্থনীতিতে আরও চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরান আরও বেশি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে, যা তাদের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা তলানিতে এসে ঠেকেছে।
অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট। অস্থিরতার কারণে পুঁজি পলায়ন, বিনিয়োগ হ্রাস এবং বৈদেশিক বাণিজ্যে মন্দা দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা উভয়ই ইরানের অর্থনীতিকে দুর্বল করে দিচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তুলছে। যুবকদের মধ্যে বেকারত্ব আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।
সমাজ গভীরভাবে মেরুকৃত হচ্ছে। সরকারের প্রতি আস্থা কমে যাচ্ছে এবং সামাজিক কাঠামোতে ফাটল দেখা দিচ্ছে। এই বিভাজন দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক সংহতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে গভীর ক্ষোভের জন্ম দিতে পারে। তরুণ প্রজন্ম একটি ভিন্ন ইরান দেখতে চাইছে।
আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার উপরও এই বিক্ষোভের প্রভাব পড়তে পারে। ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে এবং সম্ভাব্য আঞ্চলিক সংঘাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। প্রতিবেশী দেশগুলো ইরানের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে সতর্ক রয়েছে।
ভবিষ্যৎ কী?
ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি একটি জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে এই আন্দোলনের ভবিষ্যৎ। সরকার কি দমন-পীড়নের পথেই হাঁটবে, নাকি প্রকৃত সংস্কারের প্রস্তাব দেবে? ইরানের ইতিহাস মূলত কঠোর দমন-পীড়নের দিকেই ইঙ্গিত করে, তবে এবারের আন্দোলনের ব্যাপ্তি ও গভীরতা ভিন্ন।
বিক্ষোভকারীরা তাদের আন্দোলন কতটা দীর্ঘস্থায়ী করতে পারবে এবং আরও কার্যকরভাবে সংগঠিত হতে পারবে কিনা, তা একটি বড় প্রশ্ন। এখন পর্যন্ত আন্দোলনের কোনো সুস্পষ্ট নেতৃত্ব না থাকায়, এটি সরকারের জন্য দমনের সুযোগ তৈরি করেছে। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো তাদের সংগঠিত হওয়ার অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে।
অর্থনৈতিক পরিস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সংকট হয় আরও বেশি মানুষকে বিক্ষোভে ঠেলে দেবে, অথবা আন্দোলনকারীদের ক্লান্ত করে দেবে। যদি জীবনযাত্রার মান আরও খারাপ হয়, তবে জনরোষ আরও বাড়তে পারে। অন্যদিকে, যদি সরকার অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি ঘটাতে ব্যর্থ হয়, তবে অসন্তোষ জিইয়ে থাকবে।
আন্তর্জাতিক চাপ কতটা তীব্র হবে, তা-ও দেখার বিষয়। যদি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আরও কঠোর পদক্ষেপ নেয়, তবে সরকারের উপর সংস্কারের জন্য চাপ বাড়তে পারে। তবে, এখন পর্যন্ত এই চাপ মূলত বিবৃতি এবং নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। পশ্চিমা দেশগুলোর পক্ষ থেকে আরও জোরালো পদক্ষেপের দাবি উঠেছে।
ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তারিখ, যেমন বিপ্লবের বার্ষিকী বা আসন্ন নির্বাচন, নতুন করে বিক্ষোভের স্ফুলিঙ্গ তৈরি করতে পারে। এসব দিনগুলোতে সরকার ও বিক্ষোভকারী উভয় পক্ষই নিজেদের শক্তি প্রদর্শনের চেষ্টা করবে। এই ইভেন্টগুলো আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।

কয়েকটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি দেখা যেতে পারে। সরকার হয়তো আন্দোলনকে পুরোপুরি দমন করে একটি অস্থির শান্ত পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হবে। অথবা, দীর্ঘমেয়াদী, নিম্ন-স্তরের অস্থিরতা চলতে থাকবে, যা সমাজের গভীরে অসন্তোষ জিইয়ে রাখবে। খুব কম সম্ভাবনাময় হলেও, উল্লেখযোগ্য সংস্কারের পথও খোলা থাকতে পারে, যা জনগণের কিছু দাবি মেনে নিতে পারে। তবে, স্বল্পমেয়াদে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ, যদিও এটি অনেক বিক্ষোভকারীর দীর্ঘমেয়াদী আকাঙ্ক্ষা।
