সোনার দামে রোলার কোস্টার: বিনিয়োগকারীদের ভাগ্য এখন দোলাচলে!
গত কয়েক মাস ধরে আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় স্বর্ণের বাজারে এক নজিরবিহীন অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে। লাগাতার উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে সোনার দাম, যা ক্রেতা-বিক্রেতা, বিনিয়োগকারী এবং সাধারণ ভোক্তাদের মধ্যে ব্যাপক অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এই নাটকীয়তা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চলমান পরিবর্তন এবং ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনারই প্রতিফলন।
পটভূমি: স্বর্ণ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
স্বর্ণ কেবল একটি অলংকার নয়, এটি দীর্ঘকাল ধরে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময়ে একটি নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। মুদ্রাস্ফীতি, অর্থনৈতিক মন্দা, বা ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের মতো পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীরা তাদের সম্পদ সুরক্ষার জন্য প্রায়শই সোনার দিকে ঝুঁকে পড়েন। এর ফলে সোনার চাহিদা বাড়ে এবং দামও ঊর্ধ্বমুখী হয়।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
বিগত দশকগুলোতে সোনার দামের প্রবণতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা এবং ২০২০ সালের কোভিড-১৯ মহামারির সময় সোনার দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছিল। মন্দার আশঙ্কা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর আগ্রাসী মুদ্রানীতি (যেমন সুদের হার কমানো এবং তারল্য বাড়ানো) সোনার প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়িয়েছিল। এই সময়ে প্রতি আউন্স সোনার দাম $২০০০ ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল, যা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক নতুন আশার সঞ্চার করেছিল।
তবে, মহামারি-পরবর্তী সময়ে বিশ্ব অর্থনীতি যখন পুনরুদ্ধারের পথে হাঁটতে শুরু করে, তখন সোনার দামে কিছুটা স্থিতিশীলতা আসে। কিন্তু ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে আবারও নাটকীয় পরিবর্তন দেখা যেতে শুরু করে, যা ২০২৪ সালের শুরুতেও অব্যাহত রয়েছে।
সাম্প্রতিক ঘটনাবলী: লাগামহীন অস্থিরতা
২০২৩ সালের শেষ প্রান্তিক এবং ২০২৪ সালের প্রথম কয়েক মাস আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় উভয় বাজারেই সোনার দামে অভূতপূর্ব উত্থান-পতন লক্ষ্য করা গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স সোনার দাম $১৯০০ ডলার থেকে শুরু করে $২১৪০ ডলার পর্যন্ত ওঠানামা করেছে, যা স্থানীয় বাজারেও তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলেছে।
আন্তর্জাতিক বাজারের চালিকাশক্তি
মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের মুদ্রানীতি: যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলো সোনার দামের ওপর বড় প্রভাব ফেলে। সুদের হার বাড়লে ডলার শক্তিশালী হয়, ফলে ডলার-ভিত্তিক সোনার দাম কমে যায়। আবার, সুদের হার কমানোর ইঙ্গিত দিলে ডলার দুর্বল হয় এবং সোনার দাম বাড়ে। সাম্প্রতিক সময়ে ফেড কখন সুদের হার কমাবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা সোনার বাজারকে অস্থির করে তুলেছে।
ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা: ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত (বিশেষ করে গাজা উপত্যকা এবং লোহিত সাগরের উত্তেজনা) এবং অন্যান্য আঞ্চলিক সংঘাতগুলো বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। এই ধরনের পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে সোনার দিকে ঝুঁকে পড়েন, যার ফলে দাম বেড়ে যায়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ক্রয়: চীন, ভারত, তুরস্কের মতো দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো তাদের রিজার্ভ বৈচিত্র্যময় করার জন্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণে সোনা কিনছে। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিল (WGC) এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সোনার ক্রয় রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছিল, যা আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম বাড়াতে সাহায্য করেছে।
মুদ্রাস্ফীতি এবং ডলারের মান: বিশ্বব্যাপী উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি সোনার চাহিদা বাড়ায়, কারণ সোনা মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে একটি হেজ হিসেবে কাজ করে। অন্যদিকে, ডলারের মান শক্তিশালী হলে সোনার দাম কমে এবং দুর্বল হলে বাড়ে।
স্থানীয় বাজারের চিত্র
আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের স্থানীয় বাজারেও সোনার দামে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) প্রায় প্রতি সপ্তাহেই নতুন করে সোনার দাম নির্ধারণ করছে।
জানুয়ারি ২০২৪ এর প্রথম দিকে, ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার দাম ১ লাখ ১২ হাজার টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছিল, যা দেশের ইতিহাসে একটি নতুন রেকর্ড। তবে, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমার কারণে কয়েকদিনের মধ্যেই তা ১ লাখ ৮ হাজার টাকার নিচে নেমে আসে। এরপর আবার তা বেড়ে ১ লাখ ১০ হাজার থেকে ১ লাখ ১২ হাজার টাকার মধ্যে ওঠানামা করছে। এই ধরনের দ্রুত পরিবর্তন ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়কেই দ্বিধায় ফেলে দিয়েছে।
বিশেষ করে, বিয়ের মৌসুম এবং আসন্ন ঈদ ও পহেলা বৈশাখের মতো উৎসবগুলোকে কেন্দ্র করে যখন সোনার চাহিদা বাড়ার কথা, তখন এই অস্থিরতা ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতাকে প্রভাবিত করছে।
প্রভাব: কারা প্রভাবিত হচ্ছেন?
সোনার দামে এই নাটকীয়তার প্রভাব সমাজের বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়েছে।
ভোক্তা ও ক্রেতারা
যারা অলংকার বা বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে সোনা কিনতে চান, তারা এই অস্থিরতার কারণে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন। দাম বাড়ার আশঙ্কায় অনেকে দ্রুত কিনে ফেলছেন, আবার দাম কমার আশায় অনেকে অপেক্ষা করছেন। বিয়ের মতো সামাজিক অনুষ্ঠানে সোনার অলংকার একটি অপরিহার্য অংশ, তাই দামের এই ওঠানামা সাধারণ মানুষের বাজেটের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। অনেকে কম ওজনের সোনা বা বিকল্প ধাতুর দিকে ঝুঁকছেন।
জুয়েলারি শিল্প
জুয়েলারি ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। একদিকে কাঁচামাল (সোনা) কেনার খরচ নিয়ে অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে ক্রেতাদের দ্বিধাগ্রস্ততা বিক্রিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। উচ্চ দামে সোনা কিনে মজুত রাখলে দাম কমে গেলে বড় লোকসানের মুখে পড়তে হয়। আবার, দাম কমে গেলে চাহিদা বাড়লেও পর্যাপ্ত মজুত না থাকায় সুযোগ হাতছাড়া হয়। ক্ষুদ্র ও মাঝারি জুয়েলারি দোকানগুলো এই অস্থিরতার কারণে টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছে।
বিনিয়োগকারী
স্বর্ণকে যারা দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ হিসেবে দেখেন, তাদের জন্য এই অস্থিরতা একদিকে যেমন ঝুঁকি তৈরি করছে, তেমনি অন্যদিকে সুযোগও সৃষ্টি করছে। যারা কম দামে সোনা কিনেছেন, তারা এখন ভালো মুনাফা দেখতে পাচ্ছেন। আবার, যারা উচ্চ দামে কিনেছেন, তারা ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। স্বল্পমেয়াদী ফটকাবাজ বিনিয়োগকারীরা এই অস্থিরতা থেকে লাভবান হওয়ার চেষ্টা করছেন, তবে এতে ঝুঁকিও অনেক বেশি।
অর্থনীতি
বাংলাদেশের মতো দেশগুলো যেখানে সোনা আমদানি করতে হয়, সেখানে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় বেড়ে যায়। এটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এছাড়া, অনানুষ্ঠানিক পথে সোনা আমদানি বা চোরাচালান বাড়ার ঝুঁকিও থাকে, যা দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

ভবিষ্যৎ কী: পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে পারে?
স্বর্ণের বাজারের ভবিষ্যৎ গতিপথ নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। তবে কিছু মূল বিষয় রয়েছে যা আগামী দিনে সোনার দাম নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
বিশেষজ্ঞদের পূর্বাভাস
বেশিরভাগ বিশ্লেষক মনে করেন, ২০২৪ সালেও সোনার বাজারে অস্থিরতা বজায় থাকবে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাকস এবং জেপি মরগানের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো পূর্বাভাস দিয়েছে যে, ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর অব্যাহত সোনার ক্রয় সোনার দামকে সমর্থন করবে। তবে, মার্কিন ফেডের সুদের হার কমানোর সিদ্ধান্ত এবং বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতা দামের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের মতে, ২০২৪ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সোনার ক্রয় অব্যাহত থাকবে, যা সোনার দামের জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করবে। একই সাথে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ক্রমবর্ধমান মাথাপিছু আয় এবং অলংকারের প্রতি সাংস্কৃতিক আকর্ষণ সোনার চাহিদা বাড়াতে সাহায্য করবে।
নজরে রাখার মতো বিষয়
- মার্কিন ফেডের সুদের হার: ফেড কখন এবং কতবার সুদের হার কমায়, তা সোনার দামের ওপর সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলবে।
- ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি: মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে চলমান সংঘাতের তীব্রতা এবং নতুন করে কোনো উত্তেজনা সৃষ্টি হলে সোনার চাহিদা বাড়বে।
- বিশ্ব অর্থনীতি: বিশ্বব্যাপী মন্দার আশঙ্কা কমে গেলে বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শক্তিশালী হলে সোনার নিরাপদ আশ্রয়ের চাহিদা কমতে পারে।
- ডলারের মান: ডলারের সূচক (DXY) পর্যবেক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ডলারের দুর্বলতা সোনার দাম বাড়াতে সাহায্য করে।
- মুদ্রাস্ফীতির হার: বিভিন্ন দেশের মুদ্রাস্ফীতির প্রবণতা সোনার বিনিয়োগ আকর্ষণকে প্রভাবিত করবে।
বিনিয়োগকারী ও ভোক্তাদের জন্য পরামর্শ
এই অস্থির পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারী এবং ভোক্তাদের সতর্ক থাকতে হবে।
- গবেষণা ও তথ্য সংগ্রহ: বাজার সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজখবর রাখা এবং নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করা জরুরি।
- ধৈর্য ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা: স্বল্পমেয়াদী ওঠানামায় প্রভাবিত না হয়ে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের পরিকল্পনা করা উচিত।
- ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা: আপনার পোর্টফোলিওর একটি নির্দিষ্ট অংশ সোনায় বিনিয়োগ করুন, পুরো পুঁজি নয়।
- সতর্কতা: উচ্চ দামের সময় তাড়াহুড়ো করে কেনা বা কম দামে আতঙ্কিত হয়ে বিক্রি করা থেকে বিরত থাকুন।
সোনার বাজারে চলমান এই নাটকীয়তা নিঃসন্দেহে চ্যালেঞ্জিং। তবে, এর পেছনে থাকা কারণগুলো বোঝা এবং ভবিষ্যতের সম্ভাব্য গতিপথ সম্পর্কে ধারণা রাখা ব্যক্তি ও ব্যবসায়ী উভয়কেই বুদ্ধিমানের মতো সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে। বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তা যতদিন থাকবে, ততদিন সোনা তার নিজস্ব গতিতে চলতে থাকবে, কখনো রোলার কোস্টারের মতো উপরে উঠবে, আবার কখনো নিচে নামবে।
