সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে সরকারি বন্ড নিয়ে এক নতুন উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্বব্যাপী এবং স্থানীয় পর্যায়ে সুদের হার বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে ব্যাংকগুলোর বন্ড পোর্টফোলিওতে সম্ভাব্য লোকসানের বিষয়টি আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অপ্রত্যাশিত ঝুঁকির মুখে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং সামগ্রিক অর্থনীতি গভীরভাবে প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, যা দেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনার উপর নতুন করে আলোকপাত করছে।
প্রেক্ষাপট ও সময়রেখা: বন্ডে বিনিয়োগের দীর্ঘ ইতিহাস
বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো দীর্ঘকাল ধরে সরকারি বন্ড এবং ট্রেজারি বিলকে তাদের বিনিয়োগের একটি নিরাপদ মাধ্যম হিসেবে দেখে আসছে। আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং বিধিবদ্ধ তারল্য অনুপাত (Statutory Liquidity Ratio – SLR) বজায় রাখতে ব্যাংকগুলোকে তাদের মোট আমানতের একটি নির্দিষ্ট অংশ সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করতে হয়। ঐতিহাসিকভাবে, সুদের হার স্থিতিশীল এবং তুলনামূলকভাবে কম থাকায় বন্ডগুলো একটি নিশ্চিত, যদিও কম-মুনাফার উৎস ছিল।

গত দশকজুড়ে, বিশেষ করে বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর থেকে, বাংলাদেশ ব্যাংক একটি সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করেছে। এর ফলে সুদের হার দীর্ঘ সময় ধরে নিম্নমুখী ছিল, যা ব্যাংকগুলোকে সরকারি বন্ডে ব্যাপক বিনিয়োগে উৎসাহিত করে। সরকারের বাজেট ঘাটতি পূরণেও ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ঋণ গ্রহণ একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া হয়ে দাঁড়ায়। কোভিড-১৯ মহামারীর সময়কালে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা আসায় বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কমে যায়, যার ফলে ব্যাংকগুলো তাদের অতিরিক্ত তারল্য আরও বেশি করে সরকারি বন্ডে বিনিয়োগ করে। সে সময় অনেক ব্যাংকই আকর্ষণীয় সুদে দীর্ঘমেয়াদী বন্ড কিনেছিল, যা তখন একটি লাভজনক বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল।
২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত, যখন মূল্যস্ফীতি তুলনামূলকভাবে সহনীয় ছিল এবং নীতি সুদের হার কম রাখা হয়েছিল, তখন ব্যাংকগুলোর বন্ড পোর্টফোলিওতে তেমন কোনো ঝুঁকি দেখা যায়নি। কিন্তু ২০২৩ সালের শুরু থেকে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির চাপ এবং স্থানীয় অর্থনীতির স্থিতিশীলতা রক্ষায় বাংলাদেশ ব্যাংক মুদ্রানীতি কঠোর করতে শুরু করে, যা বর্তমান সংকটের মূল ভিত্তি স্থাপন করে।
সাম্প্রতিক পরিবর্তন: সুদের হার বৃদ্ধি ও বন্ডের মূল্যহ্রাস
বাংলাদেশের আর্থিক খাতে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলোর মধ্যে একটি হলো বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতিতে কঠোরতা আরোপ। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২০২৩ সালের মাঝামাঝি থেকে নীতি সুদের হার (রেপো রেট) একাধিকবার বৃদ্ধি করেছে। এর পাশাপাশি, প্রচলিত ফিক্সড ইন্টারেস্ট রেট পদ্ধতির পরিবর্তে বাজারভিত্তিক সুদের হার পদ্ধতি, স্মার্ট (SMART – Six-month Moving Average Rate of Treasury bills) চালু করা হয়েছে, যা সুদের হারের নির্ধারণে বাজারের ভূমিকা বাড়িয়েছে।
এই নীতিগত পরিবর্তনগুলোর সরাসরি প্রভাব পড়েছে সরকারি বন্ডের উপর। যখন নীতি সুদের হার বৃদ্ধি পায়, তখন নতুন ইস্যু করা সরকারি বন্ডগুলোর সুদের হারও বৃদ্ধি পায়। এর ফলে, পূর্বে ইস্যু করা এবং কম সুদের হারযুক্ত বন্ডগুলোর বাজার মূল্য কমে যায়। কারণ বিনিয়োগকারীরা এখন উচ্চ সুদের হারে নতুন বন্ড কিনতে আগ্রহী হন, ফলে পুরনো বন্ডগুলোর চাহিদা কমে যায়।
ব্যাংকগুলো তাদের বন্ড পোর্টফোলিওকে সাধারণত তিন ভাগে ভাগ করে: ‘হোল্ড টু ম্যাচুরিটি’ (Held to Maturity – HTM), ‘অ্যাভেইলেবল ফর সেল’ (Available for Sale – AFS) এবং ‘হোল্ড ফর ট্রেডিং’ (Held for Trading – HFT)। HTM বন্ডগুলো সাধারণত মেয়াদপূর্তি পর্যন্ত ধরে রাখা হয় এবং এগুলোর বাজার মূল্য ওঠানামা ব্যালেন্স শীটে সরাসরি প্রতিফলিত হয় না। তবে AFS এবং HFT বন্ডগুলোর বাজার মূল্য নিয়মিতভাবে মূল্যায়ন করা হয় এবং মূল্যহ্রাস হলে তা ব্যাংকের আর্থিক বিবরণীতে ‘অবাস্তবায়িত ক্ষতি’ (unrealized loss) হিসেবে দেখানো হয়।
বর্তমানে, অসংখ্য ব্যাংক তাদের AFS এবং HFT ক্যাটাগরির বন্ডে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অবাস্তবায়িত ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে, এমনকি HTM ক্যাটাগরির বন্ডগুলোকেও যদি মেয়াদপূর্তির আগে বিক্রি করতে হয়, তবে সেগুলোতেও লোকসান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই পরিস্থিতি ব্যাংকিং খাতের জন্য একটি নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে, কারণ এটি তাদের মূলধন পর্যাপ্ততা (Capital Adequacy Ratio – CAR) এবং সামগ্রিক আর্থিক স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এই পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং ব্যাংকগুলোকে তাদের বন্ড পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপনার বিষয়ে সতর্ক থাকার নির্দেশনা দিয়েছে।
প্রভাব: কে ক্ষতিগ্রস্ত, কীভাবে?
বন্ডের বাজার মূল্য হ্রাসের ফলে সৃষ্ট ঝুঁকি বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত এবং সামগ্রিক অর্থনীতির উপর বহুমুখী প্রভাব ফেলছে। এই পরিস্থিতির কারণে বিভিন্ন পক্ষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
ব্যাংকসমূহ: মূলধন ক্ষয় ও তারল্য সংকট
সবচেয়ে সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর উপর। তাদের বন্ড পোর্টফোলিওর মূল্যহ্রাসের কারণে ব্যাংকের মূলধন কমে যাচ্ছে। বিশেষত, যেসব ব্যাংক তাদের মূলধন পর্যাপ্ততা অনুপাত (CAR) বজায় রাখতে সংগ্রাম করছে, তাদের জন্য এটি একটি বড় ধাক্কা। মূলধন ক্ষয় হওয়ার অর্থ হলো, ব্যাংকগুলোর ঋণদান ক্ষমতা কমে যাওয়া, যা অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। যদি কোনো ব্যাংককে তারল্যের প্রয়োজনে মেয়াদপূর্তির আগেই বন্ড বিক্রি করতে হয়, তবে তাদের লোকসানে বিক্রি করতে হবে, যা তারল্য সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো (SOCBs) ঐতিহাসিকভাবে সরকারি সিকিউরিটিজে বড় বিনিয়োগ করে থাকে, তাই তারা এই ঝুঁকির প্রতি বিশেষভাবে সংবেদনশীল।
শেয়ারহোল্ডার ও বিনিয়োগকারী: আস্থাহীনতা
ব্যাংকের মূলধন কমে গেলে শেয়ারহোল্ডারদের জন্য লভ্যাংশ (dividend) পাওয়ার সম্ভাবনা কমে যায় এবং ব্যাংকের শেয়ারের মূল্য হ্রাস পেতে পারে। এটি শেয়ারবাজারে ব্যাংকিং খাতের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থাকে দুর্বল করে তোলে, যা দীর্ঘমেয়াদে নতুন মূলধন সংগ্রহে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
সরকার: ঋণের ব্যয় বৃদ্ধি
ব্যাংকগুলো যদি বন্ডে বিনিয়োগ করে ক্ষতির সম্মুখীন হয়, তবে তারা ভবিষ্যতে সরকারি বন্ড কিনতে নিরুৎসাহিত হতে পারে। এর ফলে, সরকারকে তার বাজেট ঘাটতি পূরণের জন্য নতুন বন্ড ইস্যু করার ক্ষেত্রে উচ্চ সুদের হার দিতে হতে পারে, যা সরকারের ঋণের ব্যয় বাড়িয়ে দেবে। এটি জাতীয় বাজেট ব্যবস্থাপনার উপর চাপ সৃষ্টি করবে।
আমানতকারী ও অর্থনীতি: পরোক্ষ প্রভাব
যদিও আমানতকারীদের অর্থ সরাসরি ঝুঁকির মুখে পড়ে না (কারণ ডিপোজিট ইন্স্যুরেন্স স্কিম রয়েছে), তবে ব্যাংকের সামগ্রিক দুর্বলতা আর্থিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে, যদি ব্যাংকগুলো তারল্য সংকটে ভোগে এবং ঋণদান কার্যক্রম সীমিত করে ফেলে, তবে তা বেসরকারি খাতের বিনিয়োগে বাধা দেবে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শ্লথ করে দেবে। এটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দারিদ্র্য বিমোচনের প্রচেষ্টাকেও ব্যাহত করতে পারে।
এই পরিস্থিতি সামগ্রিকভাবে দেশের আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা এবং ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যার মোকাবেলায় সুচিন্তিত নীতি ও কৌশল প্রয়োজন।
ভবিষ্যৎ পথ ও প্রত্যাশিত পদক্ষেপসমূহ
বন্ডের আড়ালে ব্যাংকিং খাতের এই ঝুঁকি মোকাবেলায় বাংলাদেশ ব্যাংক, সরকার এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে সমন্বিত ও সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ নিতে হবে। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য বেশ কিছু সম্ভাব্য পথ ও মাইলফলক চিহ্নিত করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা: পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ
কেন্দ্রীয় ব্যাংককে এই পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যেতে হবে। প্রয়োজনে, বন্ডের মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং মূলধন পর্যাপ্ততা গণনার ক্ষেত্রে আরও নমনীয় বা নির্দিষ্ট নির্দেশনা জারি করতে হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ‘হোল্ড টু ম্যাচুরিটি’ ক্যাটাগরির বন্ডগুলোর জন্য বর্তমান নিয়মাবলী বজায় রাখা এবং ‘অ্যাভেইলেবল ফর সেল’ ক্যাটাগরির বন্ডগুলোর অবাস্তবায়িত ক্ষতির প্রভাব মূলধনের উপর সাময়িকভাবে হ্রাস করার জন্য নির্দিষ্ট ছাড়ের বিষয়ে বিবেচনা করা যেতে পারে। একই সাথে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য মুদ্রানীতির কঠোরতা বজায় রাখতে হবে, তবে এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলোও সতর্কতার সাথে মূল্যায়ন করতে হবে।
সরকারের কৌশল: বিকল্প অর্থায়ন
সরকারকে ব্যাংকগুলোর উপর বাজেট ঘাটতি পূরণের চাপ কমাতে হবে। এর জন্য বিদেশি উৎস থেকে ঋণ গ্রহণ বা নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান (যেমন, সঞ্চয়পত্র) থেকে অর্থ সংগ্রহের উপর জোর দেওয়া যেতে পারে। এতে ব্যাংকগুলোর বন্ডে বিনিয়োগের বাধ্যবাধকতা কিছুটা কমবে এবং তাদের তারল্য ব্যবস্থাপনায় সুবিধা হবে। এছাড়া, দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক পরিকল্পনায় সরকারি ঋণের টেকসই মাত্রা বজায় রাখার দিকে মনোযোগ দিতে হবে।
ব্যাংকগুলোর নিজস্ব পদক্ষেপ: পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপনা
বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে তাদের বন্ড পোর্টফোলিও আরও সতর্কতার সাথে ব্যবস্থাপনা করতে হবে। সুদের হারের ঝুঁকি কমাতে দীর্ঘমেয়াদী বন্ডের উপর নির্ভরতা কমিয়ে স্বল্পমেয়াদী বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকতে পারে। এছাড়াও, মূলধন শক্তিশালী করার জন্য নতুন শেয়ার ইস্যু করা বা সংরক্ষিত মুনাফা থেকে মূলধন বাড়ানোর পদক্ষেপ নিতে পারে। প্রয়োজনে, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাথে পরামর্শ করে তাদের বন্ড পোর্টফোলিও পুনর্গঠনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
বন্ডের সেকেন্ডারি বাজার উন্নয়ন
বাংলাদেশের বন্ড বাজার এখনো ততটা সুসংগঠিত নয়। একটি শক্তিশালী এবং সক্রিয় সেকেন্ডারি বাজার বন্ডের সঠিক মূল্য নির্ধারণে এবং ব্যাংকগুলোকে তাদের পোর্টফোলিও আরও সহজে ব্যবস্থাপনা করতে সাহায্য করবে। এই বাজারকে আরও গতিশীল করার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং নীতিগত সহায়তা প্রদান করা উচিত। এতে তারল্য সংকট মোকাবেলায় ব্যাংকগুলোর সক্ষমতা বাড়বে।
আন্তর্জাতিক সহায়তা ও পরামর্শ
প্রয়োজনে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) বা বিশ্বব্যাংকের মতো আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে প্রযুক্তিগত সহায়তা ও পরামর্শ গ্রহণ করা যেতে পারে। তারা অন্যান্য দেশে অনুরূপ পরিস্থিতি মোকাবেলায় গৃহীত পদক্ষেপগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে মূল্যবান দিকনির্দেশনা দিতে পারে।
এই পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বন্ডের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ঝুঁকিগুলোকে কার্যকরভাবে মোকাবেলা করতে পারবে এবং দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারবে।
