ঐতিহাসিক ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন: কাল ভোটগ্রহণ, নতুন দিগন্তে বাংলাদেশ?
ঐতিহাসিক ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন: কাল ভোটগ্রহণ, নতুন দিগন্তে বাংলাদেশ?
আগামীকাল, ৭ই জানুয়ারি, ২০২৪, রবিবার, সারা দেশজুড়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ। সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত একটানা চলবে এই গণতান্ত্রিক মহাযজ্ঞ, যেখানে দেশের প্রায় ১১ কোটি ৯৬ লক্ষ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে আগামী দিনের নেতৃত্ব নির্বাচন করবেন। এই নির্বাচনকে ঘিরে ইতিমধ্যেই দেশজুড়ে এক উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যা গণতন্ত্রের প্রতি মানুষের অগাধ আস্থাকেই প্রতিফলিত করে।
নির্বাচনী প্রেক্ষাপট ও দীর্ঘ পথচলা
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এক দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ফসল। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের পর থেকেই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এই নির্বাচন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও জোটের মধ্যে সংলাপ, দাবি-দাওয়া, এবং পাল্টা দাবির মধ্য দিয়ে এই নির্বাচনের পথ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে নির্বাচনকালীন সরকার পদ্ধতি নিয়ে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য ছিল প্রকট, যা বারবার সংকট তৈরি করেছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে একটি বড় অংশ অনড় থাকলেও, সংবিধানের বিদ্যমান কাঠামোর অধীনেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।

নির্বাচন কমিশন (ইসি) এই নির্বাচন পরিচালনার জন্য একটি বিস্তারিত রোডম্যাপ তৈরি করে। ভোটার তালিকা হালনাগাদ, নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ, নতুন রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন এবং পুরনো দলগুলোর সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠকের মাধ্যমে ইসি নির্বাচনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে। এই প্রক্রিয়ায় প্রায় এক বছর সময় লেগেছে, যেখানে বিভিন্ন অংশীজনের মতামত গ্রহণ করা হয়েছে। কমিশনের পক্ষ থেকে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রতিশ্রুতি বারবার ব্যক্ত করা হয়েছে।
নির্বাচনী সংস্কার ও বিতর্ক
নির্বাচনী প্রক্রিয়ার শুরু থেকেই বেশ কিছু সংস্কারের দাবি ওঠে। ডিজিটাল ভোটিং মেশিন (ডিভিএম) ব্যবহার নিয়ে যেমন বিতর্ক ছিল, তেমনি ব্যালট পেপার ব্যবহারের সিদ্ধান্তও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। শেষ পর্যন্ত, অধিকাংশ আসনে ব্যালট পেপারের মাধ্যমে ভোটগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা ভোটারদের জন্য ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি। এছাড়াও, নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা এবং বিদেশি পর্যবেক্ষকদের ভূমিকা নিয়েও বিভিন্ন সময়ে বিতর্ক দেখা গেছে। এই বিতর্কগুলো সত্ত্বেও, নির্বাচন কমিশন সকল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে নির্বাচনের দিনক্ষণ চূড়ান্ত করতে সক্ষম হয়েছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে জোট গঠন ও ভাঙনের খেলাও এই নির্বাচনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। নির্বাচনের আগে বেশ কয়েকটি নতুন জোট গঠিত হয়েছে, আবার পুরনো জোটের শরিকরা ভিন্ন পথে হেঁটেছেন। এই জোটগুলো যেমন নির্বাচনী সমীকরণকে জটিল করেছে, তেমনি ভোটারদের সামনে এনেছে বহুমুখী বিকল্প। প্রধান দলগুলোর পাশাপাশি ছোট দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও এবার নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন, যা প্রতিযোগিতাকে আরও তীব্র করেছে।
সাম্প্রতিক ঘটনাবলী ও শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি
ভোটগ্রহণের প্রাক্কালে দেশজুড়ে নির্বাচনী উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যেই সকল নির্বাচনী সামগ্রী, যেমন ব্যালট পেপার, স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স, সিল, অমোচনীয় কালি ইত্যাদি দেশের ৪২ হাজারেরও বেশি ভোটকেন্দ্রে পৌঁছে দিয়েছে। কেন্দ্রগুলোতে প্রিসাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার এবং পোলিং অফিসাররা নিজ নিজ দায়িত্ব বুঝে নিয়েছেন। প্রায় ৭ লক্ষেরও বেশি নির্বাচনী কর্মকর্তা এই ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকবেন।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে দেশজুড়ে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। সেনাবাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), র্যাব, পুলিশ এবং আনসার বাহিনীর সদস্যরা ভোটকেন্দ্র ও এর আশেপাশে মোতায়েন করা হয়েছে। বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে বাড়তি নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে পর্যাপ্ত সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে, যাতে ভোটাররা নির্ভয়ে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন।
নিরাপত্তা প্রস্তুতি ও চ্যালেঞ্জ
নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যৌথভাবে একটি সমন্বিত নিরাপত্তা পরিকল্পনা তৈরি করেছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে চেকপোস্ট স্থাপন করা হয়েছে এবং টহল জোরদার করা হয়েছে। ভোটের দিন এবং এর আগের দিন থেকে কিছু এলাকায় যানবাহন চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে, যাতে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা এড়ানো যায়। মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা সীমিত করার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে, যা গুজব ও অপপ্রচার রোধে সহায়ক হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
শেষ মুহূর্তের প্রচার-প্রচারণায় প্রার্থীরা ভোটারদের মন জয়ের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। পথসভা, উঠান বৈঠক, মাইকিং এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে তারা নিজেদের বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন। যদিও প্রচারণার সময় কিছু সহিংস ঘটনা ও আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে, তবে নির্বাচন কমিশন এসব ঘটনায় দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছে। দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষক দলগুলোও নির্বাচনের সার্বিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তাদের উপস্থিতি নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রভাব ও জনআকাঙ্ক্ষা
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এই নির্বাচন কেবল একটি সরকার গঠন করবে না, বরং দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার উপর গভীর প্রভাব ফেলবে। ভোটাররা একটি স্থিতিশীল ও জনমুখী সরকার আশা করছেন, যা দেশের বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে পারবে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, নির্বাচনের পর দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি একটি নতুন মোড় নিতে পারে। একটি শক্তিশালী ও স্থিতিশীল সরকার বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে পারে, যা বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়ক হবে। অন্যদিকে, রাজনৈতিক অস্থিরতা বা অনিশ্চয়তা অর্থনীতির উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই দেশের বাণিজ্যিক ও শিল্প খাত নির্বাচনের ফলাফলের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখছে।
তরুণ ভোটারদের ভাবনা ও প্রত্যাশা
এবারের নির্বাচনে প্রায় ২ কোটি নতুন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন, যাদের মধ্যে একটি বড় অংশই তরুণ। এই তরুণ ভোটাররা দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে অত্যন্ত সচেতন এবং তারা এমন একটি সরকার প্রত্যাশা করেন যা শিক্ষা, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং পরিবেশ সংরক্ষণে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ তাদের রাজনৈতিক সচেতনতারই প্রতিফলন। তাদের ভোট দেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বে একটি বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, নির্বাচন সমাজে বিদ্যমান বিভেদ নিরসনে এবং জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠায় একটি সুযোগ তৈরি করতে পারে। শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর এবং সকল রাজনৈতিক দলের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ দেশের সামাজিক সংহতিকে শক্তিশালী করবে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের এই নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করবে এবং বৈশ্বিক মঞ্চে তার অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করবে।
ভোট গণনা ও পরবর্তী ধাপ
ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার সাথে সাথেই শুরু হবে ভোট গণনার প্রক্রিয়া। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে প্রিসাইডিং অফিসারের উপস্থিতিতে এবং প্রার্থী ও তাদের এজেন্টদের সামনে ব্যালট পেপার গণনা করা হবে। গণনা শেষে প্রতিটি কেন্দ্রের ফলাফল তাৎক্ষণিকভাবে রিটার্নিং অফিসারের কাছে পাঠানো হবে। রিটার্নিং অফিসাররা নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকার সকল কেন্দ্রের ফলাফল একত্রিত করে বেসরকারিভাবে বিজয়ী প্রার্থীর নাম ঘোষণা করবেন।
নির্বাচন কমিশন পর্যায়ক্রমে সকল নির্বাচনী এলাকার বেসরকারি ফলাফল একত্রিত করে চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করবে। এরপর নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নামের তালিকা গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে। গেজেট প্রকাশের পর নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ গ্রহণ করবেন। সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনকারী দল বা জোট সরকার গঠনের জন্য রাষ্ট্রপতিকে আহ্বান জানাবেন এবং প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের মাধ্যমে নতুন মন্ত্রিসভা গঠিত হবে।
ফলাফল ঘোষণা ও সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ
নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রক্রিয়া। কোনো প্রার্থীর ফলাফলে আপত্তি থাকলে তারা আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্বাচন ট্রাইব্যুনালে আবেদন করতে পারবেন। অতীতেও এমন ঘটনা ঘটেছে এবং আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এর সমাধান হয়েছে। নির্বাচন কমিশন একটি শক্তিশালী আইনি কাঠামো তৈরি করেছে যাতে নির্বাচনের সকল অভিযোগ ও বিতর্ক সুষ্ঠুভাবে নিষ্পত্তি করা যায়।
এই নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। এটি কেবল একটি সংসদ নির্বাচন নয়, বরং দেশের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি তাদের অবিচল আস্থার প্রতিফলন। নতুন সরকার দেশের মানুষকে কী দিতে পারবে এবং কীভাবে তারা বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করবে, তা দেখার জন্য দেশবাসী অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। আগামীকালের ভোট কেবল একটি দিনের ঘটনা নয়, এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক।
