বাজেট ২০২৬: কর্পোরেটদের বিত্তবৃদ্ধি, আমজনতার ভাগ্যে কী?
আসন্ন বাজেট ২০২৬ ঘিরে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে জল্পনা। দেশের অর্থনীতিতে এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ, যেখানে বিশেষভাবে আলোচিত হচ্ছে কর্পোরেট সংস্থা এবং সাধারণ মানুষের উপর এর ভিন্নমুখী প্রভাব। অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বাজেট ভারতের বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী, বিশেষত আম্বানি ও আদানির মতো সংস্থাগুলিকে আরও বেশি সুবিধা প্রদান করতে পারে, যা সাধারণ মানুষের জীবনে নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
পটভূমি ও পূর্ববর্তী ধারা
ভারতের অর্থনীতিতে গত কয়েক দশক ধরে বড় কর্পোরেট সংস্থাগুলির ভূমিকা অনস্বীকার্য। সরকারগুলি বরাবরই শিল্পোন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে এসেছে, যা দেশের জিডিপি বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছে। তবে, এই বৃদ্ধির সুফল সমাজের সব স্তরে সমানভাবে পৌঁছেছে কিনা, তা নিয়ে বিতর্ক দীর্ঘদিনের। বিগত কয়েক বছরের বাজেট পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সরকার পরিকাঠামো উন্নয়ন, ডিজিটাল ইন্ডিয়া এবং উৎপাদন ক্ষেত্রকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। এই ক্ষেত্রগুলিতে রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ এবং আদানি গ্রুপের মতো সংস্থাগুলির বিশাল বিনিয়োগ রয়েছে।
২০১৪ সাল থেকে ভারত সরকার 'মেক ইন ইন্ডিয়া', 'আত্মনির্ভর ভারত' এবং 'পিএলআই স্কিম' (Production Linked Incentive Scheme)-এর মতো উদ্যোগ নিয়েছে। এই প্রকল্পগুলি দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সফল হলেও, এর প্রধান সুবিধাভোগী হয়েছে বড় শিল্প সংস্থাগুলি। উদাহরণস্বরূপ, টেলিকম, শক্তি, বন্দর, বিমানবন্দর এবং সবুজ শক্তি খাতে আদানির ব্যাপক সম্প্রসারণ এবং রিটেল, টেলিকম ও পেট্রোকেমিক্যালস খাতে আম্বানির আধিপত্য এই নীতিগুলির প্রত্যক্ষ ফল। এর ফলে, এই সংস্থাগুলির বাজার মূল্য এবং সম্পদ অভূতপূর্ব বৃদ্ধি পেয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করেন, সরকারের এই নীতিগুলি দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোর উপর কর্পোরেটদের নিয়ন্ত্রণ আরও সুদৃঢ় করেছে। এর ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (MSME) এবং অসংগঠিত ক্ষেত্রের প্রতিযোগিতা করার ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। বাজেটগুলি প্রায়শই কর্পোরেট কর কমানো, বিনিয়োগের জন্য প্রণোদনা এবং সহজ ঋণ প্রদানের উপর জোর দিয়েছে, যা বৃহৎ সংস্থাগুলির জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে।
বাজেট ২০২৬-এর সম্ভাব্য মূল পরিবর্তনসমূহ
আসন্ন বাজেট ২০২৬-এ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যা দেশের অর্থনৈতিক চালচিত্রকে প্রভাবিত করতে পারে। সরকার মূলত তিনটি স্তম্ভের উপর জোর দিতে পারে: পরিকাঠামো উন্নয়ন, সবুজ শক্তি এবং ডিজিটাল রূপান্তর।
কর্পোরেট কর ও বিনিয়োগ নীতি
বাজেটে কর্পোরেট কর আরও কমানোর ঘোষণা আসতে পারে, যা দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়াও, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (SEZ) এবং উৎপাদন-সংযুক্ত প্রণোদনা (PLI) প্রকল্পের আওতা আরও বাড়ানো হতে পারে। এই ধরনের নীতিগুলি সরাসরি বৃহৎ শিল্প সংস্থাগুলিকে উপকৃত করবে, কারণ তাদের বিনিয়োগের ক্ষমতা এবং উৎপাদন স্কেল অনেক বেশি। যেমন, আদানি গ্রুপের সবুজ শক্তি প্রকল্পগুলি নতুন প্রণোদনা থেকে লাভবান হতে পারে, এবং রিলায়েন্সের ডিজিটাল পরিকাঠামো ও রিটেল ব্যবসা প্রসারিত করার জন্য বিশেষ সুবিধা পেতে পারে।
পরিকাঠামো ও শক্তি খাতে বরাদ্দ
দেশের পরিকাঠামো উন্নয়নে বিপুল অর্থ বরাদ্দ করা হতে পারে। সড়ক, রেল, বন্দর এবং বিমানবন্দর নির্মাণে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (PPP) মডেলকে আরও উৎসাহিত করা হতে পারে। আদানি গ্রুপ ইতিমধ্যেই এই ক্ষেত্রগুলিতে একটি বড় খেলোয়াড়, তাই তাদের জন্য এটি একটি বড় সুযোগ। সবুজ শক্তি খাতে, যেমন সৌর ও বায়ু শক্তি উৎপাদনে, নতুন বিনিয়োগ এবং ভর্তুকি ঘোষণা করা হতে পারে, যা আদানি গ্রিন এনার্জি এবং রিলায়েন্স নিউ এনার্জিকে সরাসরি উপকৃত করবে।
ডিজিটাল অর্থনীতি ও রিটেল
ডিজিটাল ইন্ডিয়া উদ্যোগকে আরও শক্তিশালী করতে বাজেট ২০২৬-এ ডিজিটাল পরিকাঠামো, ফাইভ-জি (5G) সম্প্রসারণ এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI) গবেষণায় বড় অঙ্কের বরাদ্দ থাকতে পারে। রিলায়েন্স জিও ইনফোকম এবং রিলায়েন্স রিটেল এই ক্ষেত্রগুলিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। ই-কমার্স এবং ডিজিটাল পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মগুলির জন্য নতুন নীতি ও প্রণোদনা তাদের বাজার আধিপত্য বাড়াতে সাহায্য করবে।
কর্পোরেট ও সাধারণ মানুষের উপর ভিন্নমুখী প্রভাব
আম্বানি-আদানির লাভবান হওয়ার কারণ
বাজেট ২০২৬-এর নীতিগুলি যদি উপরোক্ত ধারা অনুসরণ করে, তবে মুকেশ আম্বানি এবং গৌতম আদানির নেতৃত্বাধীন শিল্পগোষ্ঠীগুলি নিঃসন্দেহে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে।
- শক্তি ও পরিকাঠামো: আদানি পোর্টস অ্যান্ড এসইজেড, আদানি এন্টারপ্রাইজ এবং আদানি গ্রিন এনার্জি পরিকাঠামো ও সবুজ শক্তি খাতে সরকারি বিনিয়োগ এবং প্রণোদনা থেকে সরাসরি সুবিধা পাবে। নতুন বন্দর, বিমানবন্দর, সড়ক প্রকল্প এবং নবায়নযোগ্য শক্তি প্রকল্পগুলিতে তাদের অংশীদারিত্ব বাড়তে পারে।
- ডিজিটাল ও রিটেল: রিলায়েন্স জিও এবং রিলায়েন্স রিটেল ডিজিটাল পরিকাঠামো, ফাইভ-জি সম্প্রসারণ এবং ই-কমার্স নীতি থেকে উপকৃত হবে। তাদের বাজার শেয়ার আরও বাড়বে এবং নতুন গ্রাহক আকর্ষণে সহায়ক হবে।
- কর সুবিধা ও সহজ ঋণ: কর্পোরেট কর কমানো এবং বিনিয়োগের জন্য সহজ ঋণ প্রাপ্তি তাদের মুনাফা বাড়াবে এবং সম্প্রসারণের জন্য আরও পুঁজি সরবরাহ করবে।
এই সুবিধাগুলির ফলে তাদের বাজার মূল্য এবং ব্যক্তিগত সম্পদ আরও বৃদ্ধি পাবে, যা দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোয় তাদের প্রভাবকে আরও শক্তিশালী করবে।
সাধারণ মানুষের উপর সম্ভাব্য প্রভাব
সাধারণ মানুষের উপর বাজেট ২০২৬-এর প্রভাব মিশ্র হতে পারে, তবে অনেক ক্ষেত্রে তা চ্যালেঞ্জিং হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
- মুদ্রাস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়: পরিকাঠামো উন্নয়নে ব্যাপক ব্যয় এবং কর্পোরেটদের হাতে সম্পদ কেন্দ্রীভূত হওয়ার ফলে মুদ্রাস্ফীতি বাড়তে পারে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি পেলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়বে, বিশেষত নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর জন্য এটি কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।
- কর্মসংস্থান সৃষ্টি: যদিও কর্পোরেট বিনিয়োগ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির কথা বলে, তবে বেশিরভাগ সময়ই তা উচ্চ-দক্ষতা সম্পন্ন এবং প্রযুক্তি-নির্ভর হয়। অসংগঠিত ক্ষেত্র এবং ক্ষুদ্র শিল্পের জন্য সরাসরি কর্মসংস্থান বৃদ্ধির সুযোগ সীমিত থাকতে পারে। অটোমেশন বৃদ্ধির ফলে কিছু ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান হারানোর ঝুঁকিও থাকে।
- সামাজিক সুরক্ষা ও কল্যাণমূলক প্রকল্প: যদি বাজেটের সিংহভাগ বরাদ্দ কর্পোরেট প্রণোদনা এবং পরিকাঠামোতে চলে যায়, তবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা এবং দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচিতে বরাদ্দ হ্রাস পেতে পারে। এর ফলে সমাজের দুর্বল অংশগুলি আরও পিছিয়ে পড়তে পারে।
- আয় বৈষম্য: কর্পোরেটদের ক্রমাগত বিত্তবৃদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের সীমিত আয়ের কারণে আয় বৈষম্য আরও বাড়তে পারে। এটি সামাজিক অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক অসমতা সৃষ্টি করতে পারে।
- প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর: সরকার যদি কর্পোরেট কর কমায়, তবে রাজস্ব ঘাটতি পূরণের জন্য সাধারণ মানুষের উপর প্রত্যক্ষ (যেমন আয়কর) বা পরোক্ষ করের (যেমন জিএসটি) বোঝা বাড়াতে পারে।
ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ ও প্রত্যাশিত মাইলফলক
বাজেট ২০২৬ পেশ হওয়ার পর এর বাস্তবায়ন এবং জনজীবনে এর প্রভাব আগামী মাসগুলিতে স্পষ্ট হবে।
- সংসদে আলোচনা ও জনমত: বাজেট ঘোষণার পর সংসদে বিস্তারিত আলোচনা হবে। বিরোধী দলগুলি কর্পোরেটদের সুবিধা এবং সাধারণ মানুষের উপর প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলবে। বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন এবং অর্থনীতিবিদরাও তাদের মতামত জানাবেন।
- বাস্তবায়ন ও পর্যবেক্ষণ: বাজেট প্রস্তাবনাগুলি কীভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয় কিনা, তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। পরিকাঠামো প্রকল্পগুলির সময়সীমা এবং ব্যয় নিয়ন্ত্রণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে।
- অর্থনৈতিক সূচক: আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে দেশের জিডিপি বৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতি, কর্মসংস্থান এবং বিনিয়োগের মতো অর্থনৈতিক সূচকগুলি বাজেটের প্রকৃত প্রভাব তুলে ধরবে।
- সামাজিক প্রতিক্রিয়া: সাধারণ মানুষ, বিশেষত কৃষক, শ্রমিক এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা কীভাবে এই বাজেটকে গ্রহণ করেন, তা সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে। তাদের প্রতিক্রিয়া ভবিষ্যতের নীতি নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে।
বাজেট ২০২৬ দেশের অর্থনৈতিক গতিপথকে নতুন দিকে নিয়ে যেতে পারে। একদিকে, এটি ভারতের অর্থনৈতিক শক্তিকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে এবং বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীগুলিকে বিশ্ব মঞ্চে আরও শক্তিশালী করতে পারে। অন্যদিকে, এটি যদি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ব্যর্থ হয় এবং আয় বৈষম্য বাড়ায়, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। সরকারের উচিত একটি ভারসাম্যপূর্ণ বাজেট উপস্থাপন করা, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং সামাজিক ন্যায় উভয়কেই সমান গুরুত্ব দেবে।

