‘বেসরকারি ট্যাক্সের’ নামে চাঁদাবাজি চলবে না: জামায়াত আমির – প্রথম আলো

Viral_X
By
Viral_X
9 Min Read
#image_title

দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘদিনের এক বিষফোঁড়া হিসেবে পরিচিত ‘বেসরকারি ট্যাক্স’ বা অবৈধ চাঁদাবাজি নিয়ে সম্প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। গত ২০শে নভেম্বর, ২০২৩ তারিখে এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেছেন যে, এই ধরনের চাঁদাবাজি আর চলতে দেওয়া হবে না এবং সরকার যদি দ্রুত পদক্ষেপ না নেয়, তবে জামায়াত কঠোর আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবে। এই ঘোষণার পর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ব্যবসায়ী মহল একদিকে যেমন আশার আলো দেখছেন, তেমনি সম্ভাব্য রাজনৈতিক অস্থিরতা ও তার প্রতিকূল প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।

‘বেসরকারি ট্যাক্সের’ নামে চাঁদাবাজি চলবে না: জামায়াত আমির - প্রথম আলো

প্রেক্ষাপট

চাঁদাবাজি বাংলাদেশের একটি পুরনো এবং গভীর সমস্যা। বিভিন্ন সময়ে সরকার এর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বললেও, এর শিকড় সমাজের গভীরে প্রোথিত। ‘বেসরকারি ট্যাক্স’ মূলত স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, রাজনৈতিক দলের ক্যাডার, বা সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র কর্তৃক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে, পরিবহন খাত থেকে, এমনকি ফুটপাতের হকারদের কাছ থেকেও আদায়কৃত অবৈধ চাঁদা। এই চাঁদা আদায়ের প্রক্রিয়া এতটাই সুসংগঠিত যে, অনেক ক্ষেত্রে এটিকে একটি “নিয়মিত ফি” হিসেবে ধরে নেওয়া হয়, যা না দিলে ব্যবসা পরিচালনা করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।

চাঁদাবাজির দীর্ঘ ইতিহাস

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকেই চাঁদাবাজি বিভিন্ন রূপে সমাজে বিদ্যমান। বিশেষ করে নব্বইয়ের দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পর গণতন্ত্রের উন্মুক্ত পরিবেশে এর ব্যাপ্তি আরও বাড়ে। পরিবহন খাতে ‘লাইন খরচ’, নির্মাণ শিল্পে ‘কমিশন’, বাজারগুলোতে ‘টোল’, এবং বিভিন্ন উৎসব-পার্বণে ‘অনুদান’ আদায়ের নামে চলে এই চাঁদাবাজি। এই অবৈধ অর্থ সংগ্রহ প্রায়শই স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নীরব সমর্থনে অথবা তাদের চোখ এড়িয়ে চলে। এর ফলে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। তারা পুঁজি হারিয়ে ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হন, যা সামগ্রিকভাবে দেশের শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বাধা দেয়।

জামায়াতের পূর্ববর্তী অবস্থান

জামায়াতে ইসলামী বরাবরই দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও সুশাসনের অভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। তাদের বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে এবং বিবৃতিতে তারা এই ধরনের অবৈধ কার্যকলাপের নিন্দা জানিয়েছে। তবে, এবারের হুঁশিয়ারিটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ কারণ এটি সরাসরি একটি নির্দিষ্ট ইস্যু, অর্থাৎ ‘বেসরকারি ট্যাক্স’কে লক্ষ্য করে এবং এর বিরুদ্ধে আন্দোলনের স্পষ্ট হুমকি দেওয়া হয়েছে। এটি কেবল একটি নৈতিক অবস্থান নয়, বরং একটি সক্রিয় রাজনৈতিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত বহন করে। জামায়াত মনে করে, এই চাঁদাবাজি দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ করে তুলছে।

মূল অগ্রগতি

ডা. শফিকুর রহমানের সাম্প্রতিক বিবৃতি এই দীর্ঘদিনের সমস্যাটিকে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে এনেছে। জামায়াত আমিরের এই কঠোর বার্তা রাজনৈতিক অঙ্গনে এবং ব্যবসায়ী মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।

জামায়াত আমিরের কঠোর বার্তা

ডা. শফিকুর রহমান তার বিবৃতিতে উল্লেখ করেছেন যে, দেশের বিভিন্ন স্থানে, বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা এবং অন্যান্য বড় শহরগুলোতে ‘বেসরকারি ট্যাক্স’ আদায়ের নামে ব্যাপক চাঁদাবাজি চলছে। তিনি সুনির্দিষ্টভাবে পরিবহন খাত, পাইকারি ও খুচরা বাজার, নির্মাণ শিল্প এবং এমনকি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতকেও এই চাঁদাবাজির শিকার হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি বলেন, “দেশের জনগণ যখন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে দিশেহারা, তখন এই অবৈধ চাঁদাবাজি তাদের উপর মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দেখা দিয়েছে।” তিনি সরকারকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “যদি এই চাঁদাবাজি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে জামায়াত জনগণকে সাথে নিয়ে দেশব্যাপী কঠোর প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলতে বাধ্য হবে।”

সরকারের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া ও অন্যান্য দলের মনোভাব

জামায়াতের এই হুঁশিয়ারির পর সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রে জানা গেছে, তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। অতীতেও সরকার চাঁদাবাজি বন্ধে বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়েছে, কিন্তু তা স্বল্পস্থায়ী প্রভাব ফেলেছিল। অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে, প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এখনো এ বিষয়ে সরাসরি কোনো বিবৃতি দেয়নি, তবে তারা বরাবরই দেশে সুশাসনের অভাব এবং চাঁদাবাজির অভিযোগ উত্থাপন করে আসছে। বামপন্থী দলগুলোও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে সোচ্চার, তবে জামায়াতের এই পদক্ষেপকে তারা কীভাবে দেখছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

ব্যবসায়ী মহলের উদ্বেগ ও প্রত্যাশা

বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন, যেমন এফবিসিসিআই, বিজিএমইএ, এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সমিতির নেতারা জামায়াত আমিরের এই বক্তব্যকে স্বাগত জানিয়েছেন। তারা দীর্ঘদিন ধরে চাঁদাবাজির কারণে তাদের ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে যে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছেন, তা তুলে ধরেছেন। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির একজন জ্যেষ্ঠ সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা চাই এই চাঁদাবাজি বন্ধ হোক। এটি আমাদের ব্যবসার খরচ বাড়িয়ে দেয় এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকা কঠিন করে তোলে।” তবে, একই সাথে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন যে, যদি এই ইস্যুটি নিয়ে রাজনৈতিক সংঘাত বাড়ে, তবে তা ব্যবসার পরিবেশকে আরও অস্থির করে তুলতে পারে। তাদের মূল প্রত্যাশা হলো, সরকার যেন অবিলম্বে এই সমস্যার সমাধানে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

প্রভাব

‘বেসরকারি ট্যাক্স’ আদায়ের এই প্রক্রিয়াটি কেবল একটি আর্থিক অপরাধ নয়, এর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে দেশের অর্থনীতি, সমাজ এবং জনজীবনের ওপর।

অর্থনৈতিক প্রভাব

এই অবৈধ চাঁদাবাজির সরাসরি প্রভাব পড়ে পণ্যের উৎপাদন খরচ এবং পরিবহন ব্যয়ের ওপর। ব্যবসায়ীরা তাদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পণ্যের দাম বাড়াতে বাধ্য হন, যার ফলে শেষ পর্যন্ত এর বোঝা এসে পড়ে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর। এটি মুদ্রাস্ফীতিকে উসকে দেয় এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস করে। নতুন বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়, কারণ উদ্যোক্তারা এমন একটি পরিবেশে বিনিয়োগ করতে চান না যেখানে তাদের আয়ের একটি অংশ অবৈধভাবে চলে যায়। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলো (এসএমই) সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কারণ তাদের সীমিত পুঁজি থাকে এবং চাঁদাবাজির চাপ সহ্য করার ক্ষমতা কম থাকে। এর ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বাধা আসে এবং দারিদ্র্য বিমোচনের প্রচেষ্টায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও সুশাসনের অভাব

চাঁদাবাজি সমাজে অপরাধমূলক কার্যক্রমকে উৎসাহিত করে। যারা চাঁদাবাজি করে, তারা প্রায়শই স্থানীয় ক্ষমতাশালী বা রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে থাকে, যা তাদের আরও বেপরোয়া করে তোলে। এটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি জনগণের আস্থাকে ক্ষুণ্ণ করে, কারণ অনেক সময় ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেও প্রতিকার পান না। সুশাসনের অভাবে চাঁদাবাজি একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ধারণ করে, যেখানে ভুক্তভোগীরা ভয়ে মুখ খুলতে পারেন না। এর ফলে সমাজে এক ধরনের ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি হয় এবং আইনের শাসন দুর্বল হয়ে পড়ে।

জনজীবনে অস্থিরতা

সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণী, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং চাঁদাবাজির পরোক্ষ প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যায়, যা তাদের জীবনযাত্রার মান কমিয়ে দেয়। পরিবহন খাতে চাঁদাবাজির কারণে ভাড়া বৃদ্ধি পায়, যা প্রতিদিনের যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে প্রভাব ফেলে। ফুটপাতের হকার থেকে শুরু করে রিকশাচালক পর্যন্ত সকলেই এই চাঁদাবাজির শিকার হন, যার ফলে তাদের সীমিত আয় আরও সংকুচিত হয়। এটি সমাজে হতাশা ও ক্ষোভের জন্ম দেয়, যা সামাজিক অস্থিরতা বাড়াতে পারে।

ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ

জামায়াত আমিরের এই হুঁশিয়ারি দেশের রাজনীতিতে এবং সমাজে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা।

আন্দোলনের হুঁশিয়ারি

জামায়াত যদি তার হুঁশিয়ারি অনুযায়ী কঠোর আন্দোলনে নামে, তবে এর ধরন ও ব্যাপ্তি কেমন হবে, তা একটি বড় প্রশ্ন। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, জামায়াত বিভিন্ন সময়ে হরতাল, অবরোধ, মানববন্ধনের মতো কর্মসূচি পালন করেছে। যদি সরকার এই ইস্যুটি সমাধানে দ্রুত পদক্ষেপ না নেয়, তবে জামায়াত সারা দেশে এই চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে গণআন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা করতে পারে। এটি সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করবে এবং দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উপর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এই ধরনের আন্দোলন রাজনৈতিক অঙ্গনকে আরও উত্তপ্ত করতে পারে।

সরকারের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া

সরকার সাধারণত এই ধরনের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর হওয়ার নির্দেশ দেয় এবং চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে। তবে, মূল চ্যালেঞ্জ হলো এই অবৈধ চাঁদাবাজির পেছনে থাকা প্রভাবশালী চক্রগুলোকে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া। কেবল সাময়িক অভিযান সমস্যার সমাধান করতে পারে না। সরকার যদি জনগণের আস্থা অর্জন করতে চায় এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে চায়, তবে তাদের একটি সুসংগঠিত এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। এর মধ্যে কঠোর আইন প্রয়োগ, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ করা এবং ভুক্তভোগীদের জন্য অভিযোগের সহজ ব্যবস্থা তৈরি করা অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।

ব্যবসায়ী ও নাগরিক সমাজের ভূমিকা

ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো এবং নাগরিক সমাজ এই ইস্যুতে সরকারের উপর চাপ সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তারা ঐক্যবদ্ধভাবে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে পারে এবং সরকারের কাছে সুনির্দিষ্ট দাবি পেশ করতে পারে। গণমাধ্যমও এই সমস্যাটি তুলে ধরে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। সামগ্রিকভাবে, এটি একটি জাতীয় সমস্যা, যার সমাধানে সরকার, রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী সমাজ এবং সাধারণ জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।

Share This Article