ইরান সংকট: ট্রাম্পের নতুন চাল? ব্যর্থতার দায় কি মিত্রদের কাঁধে চাপছে?
মার্কিন রাজনৈতিক মহলে সম্প্রতি এক নতুন জল্পনা তীব্র হয়েছে: প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কি ইরানের বিরুদ্ধে তার প্রশাসনের কৌশলগত ব্যর্থতার দায় মিত্র দেশগুলোর ওপর চাপিয়ে নিজেকে মুক্ত করতে চাইছেন? এই বিতর্ক মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নীতি এবং ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে ওয়াশিংটনের জটিল সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে, যা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিশেষ করে, ট্রাম্পের সম্ভাব্য পুনঃনির্বাচন বা তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের প্রেক্ষাপটে এই কৌশলগত দায়মুক্তির চেষ্টা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। এর ফলে ভবিষ্যতে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি এবং বৈশ্বিক জোটগুলোর স্থায়িত্ব নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।

পটভূমি: ট্রাম্পের ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতি
২০১৭ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের প্রতি একটি কঠোর নীতি গ্রহণ করেন, যা 'সর্বোচ্চ চাপ' (Maximum Pressure) অভিযান নামে পরিচিতি লাভ করে। এই নীতির মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করা, ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন সীমিত করা এবং মধ্যপ্রাচ্যে দেশটির আঞ্চলিক প্রভাব খর্ব করা।
জেসিপিওএ থেকে প্রত্যাহার
২০১৮ সালের মে মাসে ট্রাম্প প্রশাসন ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক ইরান পারমাণবিক চুক্তি, যা জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অফ অ্যাকশন (JCPOA) নামে পরিচিত, তা থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেয়। এই চুক্তিটি ইরান এবং পি৫+১ (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, চীন ও রাশিয়া) দেশগুলোর মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছিল। ট্রাম্প চুক্তিটিকে ‘ভয়াবহ’ এবং ‘ত্রুটিপূর্ণ’ আখ্যা দিয়েছিলেন, দাবি করেছিলেন এটি ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা রোধে যথেষ্ট নয়।
নিষেধাজ্ঞার পুনর্রোপণ ও অর্থনৈতিক চাপ
জেসিপিওএ থেকে প্রত্যাহারের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর ব্যাপক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা পুনরায় আরোপ করে। এর মধ্যে ছিল ইরানের তেল রপ্তানি, ব্যাংকিং এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতের ওপর নিষেধাজ্ঞা। এর উদ্দেশ্য ছিল ইরানের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেশটির সরকারকে আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য করা এবং তাদের নীতি পরিবর্তন করা।
আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধি
ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির ফলে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পায়। ২০১৯ সালে পারস্য উপসাগরে একাধিক তেল ট্যাংকারে হামলা, সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত করার মতো ঘটনা ঘটে। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে বাগদাদে মার্কিন ড্রোন হামলায় ইরানের শীর্ষ সামরিক কমান্ডার কাসেম সোলেইমানিকে হত্যা করা হয়, যা দুই দেশের মধ্যে প্রায় সরাসরি যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি করেছিল।
লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থতা
‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতি সত্ত্বেও, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি, বরং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের আঞ্চলিক প্রভাবও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়নি। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই নীতি ইরানের অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করলেও, দেশটির আচরণে মৌলিক পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ হয়েছে।
সাম্প্রতিক অগ্রগতি: দায় চাপানোর কৌশল?
ট্রাম্পের সম্ভাব্য 'দায় চাপানোর' কৌশল সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন আলোচনা এবং বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। এর মূল ভিত্তি হলো এই ধারণা যে, ট্রাম্প তার ইরান নীতির ব্যর্থতার জন্য মিত্র দেশগুলোকে দায়ী করে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে চাইবেন।
মিত্রদের ‘অসহযোগিতা’র অভিযোগ
বিভিন্ন প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, ট্রাম্প এবং তার ঘনিষ্ঠরা যুক্তি দিতে পারেন যে, ইউরোপীয় মিত্ররা (বিশেষ করে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এবং জার্মানি, যাদেরকে E3 দেশ বলা হয়) জেসিপিওএ থেকে সরে আসার পর মার্কিন নিষেধাজ্ঞাকে যথেষ্ট সমর্থন করেনি। তারা ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল এবং চুক্তির শর্তগুলো মেনে চলার জন্য একটি বিশেষ আর্থিক প্রক্রিয়া (INSTEX) চালু করেছিল। ট্রাম্পের যুক্তি হতে পারে, এই পদক্ষেপগুলো তার সর্বোচ্চ চাপ নীতিকে দুর্বল করেছে।
এছাড়াও, মধ্যপ্রাচ্যের কিছু মিত্র দেশ, যেমন সৌদি আরব বা সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপের জন্য যথেষ্ট সমর্থন দেয়নি বলেও অভিযোগ উঠতে পারে।
নির্বাচনী কৌশল হিসেবে দায়মুক্তি
যদি ট্রাম্প ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, তবে ইরান নীতির ব্যর্থতার দায় অন্যের ওপর চাপানো তার একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী কৌশল হতে পারে। তিনি ভোটারদের কাছে নিজেকে এমন একজন নেতা হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইতে পারেন যিনি ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, কিন্তু মিত্রদের ‘দুর্বলতা’ বা ‘অসহযোগিতা’র কারণে সম্পূর্ণ সাফল্য আসেনি। এটি তার ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করতে পারে এবং তার পররাষ্ট্রনীতির সমালোচনাগুলো প্রতিহত করতে সাহায্য করতে পারে।
প্রভাব: কারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন?
এই ধরনের 'দায় চাপানোর' কৌশল আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে।
মার্কিন-ইউরোপীয় সম্পর্ক
ট্রাম্পের এই কৌশল নিঃসন্দেহে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে সম্পর্ককে আরও খারাপ করবে। জেসিপিওএ থেকে প্রত্যাহারের পর থেকেই এই সম্পর্কগুলো চাপে রয়েছে। নতুন করে দায় চাপানো হলে পারস্পরিক অবিশ্বাস আরও বাড়বে এবং ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক সংকট মোকাবিলায় যৌথ পদক্ষেপ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। ইউরোপীয় দেশগুলো নিজেদের সার্বভৌমত্ব এবং নীতির ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ হিসেবে এটিকে দেখতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র দেশগুলো
সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ইসরায়েলের মতো মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র দেশগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এই দেশগুলো ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। যদি ট্রাম্প তাদের ওপর ব্যর্থতার দায় চাপানোর চেষ্টা করেন, তবে তারা নিজেদেরকে পরিত্যক্ত বা ভুল বোঝানো হয়েছে বলে মনে করতে পারে, যা এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে আরও জটিল করে তুলবে।
ইরান এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে এবং মিত্রদের মধ্যে বিভাজন ইরানকে আরও সাহসী করতে পারে। তারা এটিকে মার্কিন দুর্বলতার লক্ষণ হিসেবে দেখতে পারে এবং তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক কার্যকলাপ চালিয়ে যেতে উৎসাহিত হতে পারে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেতে পারে এবং আঞ্চলিক সংঘাতের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
বৈশ্বিক জোট ব্যবস্থার ওপর প্রভাব
ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি এবং মিত্রদের ওপর দায় চাপানোর প্রবণতা বৈশ্বিক জোট ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। ন্যাটো, জি৭-এর মতো জোটগুলো দুর্বল হতে পারে এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে যেতে পারে। এর ফলে ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তন, সন্ত্রাসবাদ বা মহামারী-এর মতো বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা কঠিন হবে।
ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ: কী হতে পারে?
ট্রাম্পের এই সম্ভাব্য কৌশল ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে।
ট্রাম্পের প্রকাশ্য ঘোষণা
যদি ট্রাম্প ২০২৪ সালের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, তবে তিনি তার প্রচারণার অংশ হিসেবে এই দায় চাপানোর কৌশল আরও স্পষ্ট করে তুলে ধরতে পারেন। বিভিন্ন জনসভা, সাক্ষাৎকার বা সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে তিনি তার ইরান নীতির ‘সফলতা’ এবং মিত্রদের ‘ব্যর্থতা’ নিয়ে কথা বলতে পারেন।
মিত্রদের প্রতিক্রিয়া
ইউরোপীয় এবং মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র দেশগুলো সম্ভবত ট্রাম্পের এই ধরনের অভিযোগের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানাবে। তারা নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে পারে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের প্রতি ন্যায্য আচরণ করার আহ্বান জানাতে পারে। এর ফলে কূটনৈতি সম্পর্ক আরও খারাপ হতে পারে।
বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের চ্যালেঞ্জ
বর্তমান বাইডেন প্রশাসনকে এই ধরনের আলোচনার প্রভাব মোকাবিলা করতে হবে। তাদের একদিকে ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করতে হবে, অন্যদিকে মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামত করতে হবে। ট্রাম্পের এই কৌশল বাইডেন প্রশাসনের ইরান নীতিকেও জটিল করে তুলতে পারে।
ইরান পারমাণবিক চুক্তির ভবিষ্যৎ
ট্রাম্পের এই ধরনের পদক্ষেপ ইরান পারমাণবিক চুক্তির পুনরুজ্জীবনের সম্ভাবনাকে আরও ক্ষীণ করতে পারে। যদি মিত্রদের মধ্যে বিভাজন বাড়ে, তবে ইরানের সঙ্গে একটি নতুন চুক্তিতে পৌঁছানো আরও কঠিন হয়ে পড়বে, যা বৈশ্বিক অপ্রসারণ প্রচেষ্টার জন্য একটি বড় ধাক্কা হবে।
সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের সম্ভাব্য এই কৌশল আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে, যেখানে জোটের সংহতি এবং পারস্পরিক বিশ্বাস মারাত্মকভাবে পরীক্ষিত হবে।
