খুনের অভিযোগ মিথ্যা? বেলডাঙার পরিযায়ী শ্রমিকের মৃত্যুতে চাঞ্চল্যকর মোড়!
পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের বেলডাঙার এক পরিযায়ী শ্রমিকের মৃত্যু ঘিরে দানা বাঁধা রহস্যে নতুন মোড়। মাস খানেক আগে ঝাড়খণ্ডে তাঁর মৃতদেহ উদ্ধার হওয়ার পর পরিবার ও স্থানীয়দের পক্ষ থেকে খুনের অভিযোগ তোলা হয়েছিল। কিন্তু সম্প্রতি ঝাড়খণ্ড পুলিশ ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে পেয়ে জানিয়েছে, ওই শ্রমিক খুন হননি। পুলিশের এই ঘোষণায় একদিকে যেমন তদন্তের গতিপথ পাল্টে গেছে, তেমনই মৃত শ্রমিকের পরিবার ও এলাকায় নতুন করে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
ঘটনাটি ঘটেছিল প্রায় মাসখানেক আগে ঝাড়খণ্ডের এক প্রত্যন্ত এলাকায়, যেখানে ওই শ্রমিক কাজ করতেন। তাঁর মৃতদেহ উদ্ধারের পর থেকেই পরিবার দাবি করে আসছিল যে, তাঁকে খুন করা হয়েছে এবং এই ঘটনার পেছনে গভীর ষড়যন্ত্র রয়েছে। তাদের এই দাবিতে সায় দিয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক মহলও সরব হয়েছিল।
প্রেক্ষাপট ও সময়রেখা
মৃত পরিযায়ী শ্রমিকের নাম ছিল শেখ রফিকুল ইসলাম (নাম পরিবর্তিত)। তিনি মুর্শিদাবাদের বেলডাঙা থানার অন্তর্গত এক গ্রাম থেকে কাজের সন্ধানে ঝাড়খণ্ডে পাড়ি দিয়েছিলেন। সেখানে তিনি একটি নির্মাণস্থলে বা ইটভাটায় শ্রমিকের কাজ করতেন। গত মাসের মাঝামাঝি সময়ে ঝাড়খণ্ডের রামগড় জেলার একটি প্রত্যন্ত এলাকা থেকে তাঁর মৃতদেহ উদ্ধার হয়। স্থানীয় পুলিশ প্রাথমিক তদন্ত শুরু করলেও, রফিকুলের পরিবারের কাছে খবর পৌঁছানোর পর থেকেই বিষয়টি ভিন্ন মাত্রা পায়।
পরিবারের সদস্যরা ঝাড়খণ্ডে পৌঁছে মৃতদেহ শনাক্ত করেন। তাদের দাবি ছিল, রফিকুলের শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল এবং এটি স্পষ্টতই একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। পরিবারের পক্ষ থেকে ঝাড়খণ্ড পুলিশে খুনের অভিযোগ দায়ের করা হয়। এই অভিযোগের ভিত্তিতে ঝাড়খণ্ড পুলিশ একটি অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা রুজু করে এবং তদন্ত শুরু করে। মৃতদেহ ময়নাতদন্তের জন্য স্থানীয় হাসপাতালে পাঠানো হয়।
বেলডাঙায় রফিকুলের মৃত্যুর খবর পৌঁছানোর পর এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। পরিবার, প্রতিবেশী ও স্থানীয় বাসিন্দারা একযোগে খুনের বিচার চেয়ে সরব হন। তাঁদের দাবি ছিল, অবিলম্বে দোষীদের গ্রেফতার করে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বও এই ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে এবং রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য ঝাড়খণ্ড সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করার আবেদন জানানো হয়। রফিকুলের পরিবার অত্যন্ত দরিদ্র হওয়ায়, তাঁর মৃত্যুতে আর্থিক ও মানসিক উভয় দিক থেকেই চরম সংকটের মুখে পড়েছিল।
পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছিল যে, রফিকুলকে শেষবার তাঁর কর্মস্থলের কয়েকজন সহকর্মীর সঙ্গে দেখা গিয়েছিল। এরপর থেকেই তিনি নিখোঁজ ছিলেন এবং পরে তাঁর মৃতদেহ উদ্ধার হয়। এই অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ সেই সহকর্মীদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করে। তবে, ময়নাতদন্তের রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছিল, যা এই মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল।
মূল অগ্রগতি ও সাম্প্রতিক পরিবর্তন
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে ঝাড়খণ্ড পুলিশের হাতে এসে পৌঁছেছে শেখ রফিকুল ইসলামের ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত রিপোর্ট। এই রিপোর্ট পাওয়ার পরই রামগড় জেলার পুলিশ সুপার সাংবাদিক সম্মেলন করে চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেন। তিনি জানান, ময়নাতদন্তের রিপোর্টে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে যে, রফিকুল ইসলামের শরীরে এমন কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি যা খুনের ইঙ্গিত দেয়। রিপোর্টে মৃত্যুর কারণ হিসেবে অভ্যন্তরীণ অসুস্থতা বা অন্য কোনো প্রাকৃতিক কারণের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে, যা কোনো বাহ্যিক আঘাত বা আক্রমণের ফল নয়।
পুলিশ সুপার আরও জানান, ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা মৃতদেহ পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা করে দেখেছেন এবং তাঁদের রিপোর্টে কোনো ধরণের সহিংসতা বা বলপ্রয়োগের প্রমাণ মেলেনি। প্রাথমিক অবস্থায় যে বাহ্যিক আঘাতের চিহ্ন দেখা গিয়েছিল বলে পরিবার দাবি করেছিল, সেগুলি সম্ভবত মৃত্যুর পরের ঘটনা বা অন্য কোনো কারণে সৃষ্টি হয়েছিল, যা সরাসরি মৃত্যুর কারণ নয়। ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকদের মতে, রফিকুলের মৃত্যু কোনো অপরাধমূলক কার্যকলাপের ফল নয়।
ঝাড়খণ্ড পুলিশ জানিয়েছে, ময়নাতদন্তের রিপোর্টে কোনো সন্দেহজনক বিষয় না থাকায়, তারা খুনের অভিযোগের তদন্ত বন্ধ করে দেবে। তবে, তারা একটি অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা হিসেবে তদন্ত চালিয়ে যাবে, যাতে মৃত্যুর সঠিক কারণ আরও বিশদভাবে প্রতিষ্ঠা করা যায়। এর মধ্যে বিষক্রিয়া বা অন্য কোনো আকস্মিক কারণ ছিল কিনা, তা খতিয়ে দেখতে ভিসেরা রিপোর্ট এবং অন্যান্য রাসায়নিক পরীক্ষার ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছে। পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে রফিকুলের পরিবারকে এই নতুন তথ্যের বিষয়ে অবগত করা হয়েছে।
প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া
ঝাড়খণ্ড পুলিশের এই ঘোষণায় রফিকুল ইসলামের পরিবার গভীর হতাশায় ডুবেছে। শুরু থেকেই খুনের অভিযোগ করে আসা পরিবারটি এখন দ্বিধায় ভুগছে। তাদের বক্তব্য, তাঁরা কীভাবে বিশ্বাস করবেন যে তাঁদের সন্তান খুন হননি, যখন তাঁদের চোখে স্পষ্ট আঘাতের চিহ্ন ধরা পড়েছিল? পরিবারের সদস্যরা এই রিপোর্ট মেনে নিতে রাজি নন এবং তাঁরা দ্বিতীয়বার ময়নাতদন্তের দাবি জানাতে পারেন বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন। এই সিদ্ধান্ত তাদের জন্য এক নতুন মানসিক আঘাত নিয়ে এসেছে, কারণ তারা বিচার পাওয়ার আশায় বুক বেঁধেছিলেন।
বেলডাঙার স্থানীয় মহলেও এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেকে পুলিশের এই সিদ্ধান্তে বিস্মিত হয়েছেন, আবার কেউ কেউ মনে করছেন যে, পরিযায়ী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়, কারণ তাদের মৃত্যুর কারণ যাই হোক না কেন, ভিন রাজ্যে তাদের এমন পরিণতি কাম্য নয়। এই ঘটনা পরিযায়ী শ্রমিকদের পরিবারগুলিতে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে, কারণ তাদের প্রিয়জনরা কাজের সন্ধানে ভিন রাজ্যে গিয়ে প্রায়শই নানা প্রতিকূলতার শিকার হন।

পুলিশের এই রিপোর্ট একদিকে যেমন তদন্তকারীদের ওপর থেকে খুনের মামলার চাপ কমিয়েছে, তেমনই অন্যদিকে রফিকুল ইসলামের মৃত্যুর আসল কারণ নিয়ে আরও গভীরে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে। তবে, পরিবারের কাছে ন্যায়বিচারের প্রশ্নটি এখনও অমীমাংসিতই রয়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে পুলিশের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল, পরিবারের আস্থা অর্জন করা এবং মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে তাদের সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট করা।
ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ
ঝাড়খণ্ড পুলিশ এখন ময়নাতদন্তের রিপোর্টের ভিত্তিতে তাদের তদন্তের গতিপথ পরিবর্তন করবে। খুনের অভিযোগের তদন্ত বন্ধ করে, তারা এখন রফিকুল ইসলামের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে মনোযোগ দেবে। এর মধ্যে ভিসেরা রিপোর্ট এবং অন্যান্য ফরেনসিক পরীক্ষার ফলাফল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। যদি ভিসেরা রিপোর্টে কোনো বিষক্রিয়া বা অন্য কোনো অস্বাভাবিক রাসায়নিকের উপস্থিতি ধরা পড়ে, তাহলে তদন্ত নতুন দিকে মোড় নিতে পারে।
পরিবারের পক্ষ থেকে দ্বিতীয় ময়নাতদন্তের দাবি উঠলে, পুলিশকে সেই বিষয়ে বিবেচনা করতে হতে পারে। তবে, এটি একটি জটিল প্রক্রিয়া এবং এর জন্য আদালতের অনুমতি প্রয়োজন হতে পারে। এছাড়াও, পরিবারের কাছে বিস্তারিত তথ্য এবং ময়নাতদন্তের রিপোর্টের কপি সরবরাহ করা পুলিশের দায়িত্ব। ঝাড়খণ্ড পুলিশ এবং পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের মধ্যে এই বিষয়ে আরও সমন্বয় ও তথ্য আদান-প্রদান প্রয়োজন।
রফিকুল ইসলামের মৃতদেহ যদি এখনও পরিবারের কাছে হস্তান্তর না করা হয়ে থাকে, তাহলে দ্রুত সেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। পরিবারের পক্ষ থেকে যদি কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়, যেমন হাইকোর্টে রিট পিটিশন দাখিল করা, তাহলে বিষয়টি আরও জটিল হতে পারে। এই ঘটনা পরিযায়ী শ্রমিকদের নিরাপত্তা এবং ভিন রাজ্যে তাদের মৃত্যুর ঘটনাগুলির সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিত করার গুরুত্ব আবারও তুলে ধরেছে। সরকার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এই ধরনের ঘটনাগুলির প্রতি আরও সংবেদনশীল হতে হবে এবং শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
