দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে প্রার্থিতা বাতিল ও গ্রহণ সংক্রান্ত বিষয়ে মোট ৬৪৫টি আপিল জমা পড়েছে নির্বাচন কমিশনে। আগামীকাল, ১১ই ডিসেম্বর, সোমবার থেকে এই আপিলগুলোর শুনানি শুরু হচ্ছে। হাজার হাজার প্রার্থীর মধ্যে যারা রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট, তাদের জন্য এটি নিজেদের প্রার্থিতা পুনরুদ্ধারের শেষ সুযোগ, যা দেশের নির্বাচনী আবহে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
পটভূমি ও সময়রেখা
আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন এখন সরগরম। নির্বাচন কমিশন (ইসি) ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৭ই জানুয়ারি ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ছিল ৩০শে নভেম্বর, যেখানে ২,৭০০-এরও বেশি সম্ভাব্য প্রার্থী তাদের মনোনয়নপত্র দাখিল করেন।
১লা ডিসেম্বর থেকে ৪ঠা ডিসেম্বর পর্যন্ত রিটার্নিং কর্মকর্তারা (আর.ও.) মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই সম্পন্ন করেন। এই প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন কারণে প্রায় ৭০০-এরও বেশি মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়, যার মধ্যে স্বতন্ত্র ও দলীয় উভয় প্রার্থীর মনোনয়নপত্র ছিল।
রিটার্নিং কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করার জন্য ৫ই ডিসেম্বর থেকে ৯ই ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচ দিনের সময়সীমা নির্ধারিত ছিল। এই সময়ের মধ্যে, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে মোট ৬৪৫টি আপিল জমা পড়েছে। বেশিরভাগ আপিলই মনোনয়নপত্র বাতিলের বিরুদ্ধে, তবে কিছু ক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র গ্রহণের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করেও আপিল করেছেন।

মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া
মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই একটি কঠোর প্রক্রিয়া। রিটার্নিং কর্মকর্তারা প্রার্থীর হলফনামা, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, শিক্ষাগত যোগ্যতা, ঋণ সংক্রান্ত তথ্য, ইউটিলিটি বিলের বকেয়া, ফৌজদারি মামলার বিবরণ, দ্বৈত নাগরিকত্ব এবং প্রার্থীর সমর্থক ও প্রস্তাবকের তথ্য পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করেন। সামান্য ত্রুটি বা অসামঞ্জস্যের কারণেও মনোনয়নপত্র বাতিল হতে পারে, যা নির্বাচন বিধিমালা অনুযায়ী প্রয়োগ করা হয়।
আপিলের কারণসমূহ
৬৪৫টি আপিলের কারণগুলোর মধ্যে প্রধান হলো ঋণখেলাপি হওয়া, ইউটিলিটি বিল বকেয়া থাকা, হলফনামায় ভুল বা অসম্পূর্ণ তথ্য দেওয়া, ফৌজদারি মামলার তথ্য গোপন করা, এবং প্রার্থীর বয়স সংক্রান্ত জটিলতা। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ভোটারের সমর্থনসূচক স্বাক্ষর জমা দিতে ব্যর্থ হওয়া বা ভুয়া স্বাক্ষর জমা দেওয়ার অভিযোগেও মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। এই আপিলগুলো এখন নির্বাচন কমিশনের সামনে এক চ্যালেঞ্জ, যেখানে তাদের প্রতিটি মামলার মেরিট যাচাই করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
মূল অগ্রগতি ও কর্মপদ্ধতি
৬৪৫টি আপিলের দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য নির্বাচন কমিশন একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। আগামীকাল, ১১ই ডিসেম্বর, সোমবার সকাল ৯টা থেকে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে এই শুনানি শুরু হবে।
কমিশন মোট পাঁচটি বেঞ্চ গঠন করেছে, যার প্রতিটি একজন নির্বাচন কমিশনারের নেতৃত্বে পরিচালিত হবে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল নিজেও একটি বেঞ্চের নেতৃত্ব দেবেন। অন্য চার নির্বাচন কমিশনার – মো. আহসান হাবিব খান, রাশেদা সুলতানা, মো. আলমগীর এবং আনিছুর রহমান বাকি বেঞ্চগুলোর নেতৃত্ব দেবেন। বেঞ্চগুলো প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে শুনানি পরিচালনা করবে।
বেঞ্চ এবং কর্মপদ্ধতি
প্রতিটি বেঞ্চ প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৪০টি আপিলের শুনানি করবে। এই হিসেবে, পাঁচ দিনের মধ্যে সকল আপিলের শুনানি সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। আপিলকারীদের তাদের আপিলের স্বপক্ষে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, আইনি যুক্তি এবং সাক্ষ্যপ্রমাণ উপস্থাপন করতে হবে। নির্বাচন কমিশন উভয় পক্ষের (আপিলকারী এবং রিটার্নিং কর্মকর্তা/প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী) বক্তব্য শুনে নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত প্রদান করবে।
আইনি দিক
জনপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (RPO), ১৯৭২ অনুযায়ী, রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ রয়েছে। নির্বাচন কমিশন এই আপিলগুলোর শুনানি করে তিনটি সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত দিতে পারে: রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্ত বহাল রাখা, সিদ্ধান্ত বাতিল করে মনোনয়নপত্র গ্রহণ করা, অথবা সিদ্ধান্ত সংশোধন করা। নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।
প্রভাব ও তাৎপর্য
এই ৬৪৫টি আপিলের শুনানি এবং তার ফলাফল আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের গতিপ্রকৃতিতে গভীর প্রভাব ফেলবে। এটি কেবল প্রার্থীর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নয়, বরং সামগ্রিক নির্বাচনী আবহেও এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে।
যাদের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে, তাদের জন্য এটি শেষ সুযোগ নিজেদের প্রার্থিতা পুনরুদ্ধার করার। বহু প্রভাবশালী নেতা এবং জনপ্রিয় প্রার্থীর ভাগ্য এখন নির্বাচন কমিশনের হাতে। তাদের প্রার্থিতা ফিরে পেলে সংশ্লিষ্ট আসনে নির্বাচনী সমীকরণ পাল্টে যেতে পারে। অন্যদিকে, যাদের মনোনয়নপত্র গৃহীত হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে আপিল হয়েছে, তাদের জন্যও এটি এক অগ্নিপরীক্ষা।
রাজনৈতিক দলগুলোর জন্যও এই প্রক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দলের মনোনীত প্রার্থীর ভাগ্য নির্ধারণের ওপর ভিত্তি করে তাদের নির্বাচনী কৌশল, প্রচারণার ধরন এবং এমনকি জোটবদ্ধতার সমীকরণও পুনর্গঠিত হতে পারে। একটি দলের মূল প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল হলে, তাদের বিকল্প প্রার্থী বা কৌশল নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।
ভোটারদের জন্যও এই শুনানি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা ঘোষণার পরই ভোটাররা তাদের পছন্দের প্রার্থী সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাবেন এবং সে অনুযায়ী তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। এই প্রক্রিয়া নির্বাচনের সামগ্রিক বিশ্বাসযোগ্যতা এবং নিরপেক্ষতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব ভাবমূর্তির জন্যও এই শুনানি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বিপুল সংখ্যক আপিল দ্রুত, নিরপেক্ষ এবং দক্ষতার সাথে নিষ্পত্তি করা কমিশনের সক্ষমতা ও নিরপেক্ষতার প্রমাণ দেবে, যা দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থাপনার প্রতি জনগণের বিশ্বাসকে আরও সুদৃঢ় করবে।
পরবর্তী পদক্ষেপ ও প্রত্যাশিত মাইলফলক
নির্বাচন কমিশন আশা করছে, আগামী ১৪ই ডিসেম্বরের মধ্যে সকল আপিলের শুনানি সম্পন্ন হবে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হবে। এই সময়ের মধ্যে আপিলগুলোর নিষ্পত্তি করে প্রার্থীদের চূড়ান্ত তালিকা প্রস্তুত করা হবে।
১৫ই ডিসেম্বর, শুক্রবার, চূড়ান্তভাবে বৈধ ঘোষিত প্রার্থীদের মধ্যে প্রতীক বরাদ্দ করা হবে। প্রতীক বরাদ্দের পর প্রার্থীরা আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা শুরু করতে পারবেন।
নির্বাচন কমিশন কর্তৃক ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী ৭ই জানুয়ারি, ২০২৪ তারিখে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এই আপিল প্রক্রিয়ার সফল সমাপ্তি একটি সুষ্ঠু, প্রতিযোগিতামূলক এবং বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের পথ প্রশস্ত করবে বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে। নির্বাচন কমিশন এই পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষণ করছে এবং আশা করা হচ্ছে যে, সকল আইনি বিধিবিধান অনুসরণ করে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দেওয়া সম্ভব হবে।
